অলিগলিতে মাদকের থাবা: অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছে পাইকগাছা

পাইকগাছা (খুলনা) প্রতিনিধি পাইকগাছা (খুলনা) প্রতিনিধি
  প্রকাশিত হয়েছেঃ   ১৬ মে ২০২৬, ৯:২৭ পিএম

খুলনার পাইকগাছা উপজেলায় প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে মাদকের মরণকামড়। একসময়ের শান্ত, নিরিবিলি ও কৃষিনির্ভর এই জনপদটি এখন ভয়ংকর মাদক আগ্রাসনের মুখে পড়েছে। অলিগলিতে মাদকের থাবা,অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছে পাইকগাছা। ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিলসহ নানা ধরনের নিষিদ্ধ মাদক এখন আর গোপন কোনো বিষয় নয়—হাত বাড়ালেই মিলছে। অলিগলি, বাজার, বাসস্ট্যান্ড, ব্রিজের নিচ, নদীপাড় এমনকি আদালত, হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশপাশেও চলছে মাদক কেনাবেচা ও সেবন। এতে করে কিশোর- তরুণদের একটি বড় অংশ মাদকের জালে জড়িয়ে পড়ছে, যা পুরো সমাজকে ঠেলে দিচ্ছে অন্ধকার futures (ভবিষ্যতের) দিকে।

​​স্থানীয়দের অভিযোগ, পৌরসভার জিরো পয়েন্ট, বাসস্ট্যান্ড, রিস্কির মোড় (পাইকগাছা সরকারি কলেজের পিছনে), পুরাতন পরিবহন কাউন্টার, কোর্ট প্রাঙ্গণ, মাছ কাঁটা, হাসপাতাল এলাকা, শিববাটি ব্রিজের নিচ, ওয়াপদা পাড়া ও বালির মাঠ,এসব জায়গা এখন কার্যত মাদক কারবারের পরিচিত পয়েন্ট। দিনের আলোতেই লেনদেন হয়, আর সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়।

​একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, চায়ের দোকানগুলো মাদক বেচাকেনার নিরাপদ আড্ডায় পরিণত হয়েছে। “চা খেতে বসে হাত বাড়ালেই ইয়াবা বা গাঁজা পাওয়া যায়”—এ কথা এখন অনেকটাই ‘ওপেন সিক্রেট’। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর এসব এলাকায় বখাটে ও মাদকসেবীদের আনাগোনা বাড়ে।

​শুধু পৌর সদর নয়, গদাইপুর, বান্দিকাটি, নতুন বাজার, কপিলমুনি, ভিলেজ পাইকগাছা, বাঁকা বাজার, গড়ইখালী, কাটিপাড়া, চাঁদখালি, কাটাখালী ও হরিঢালীসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে সহ আরো অনেক পয়েন্টে মাদক বাণিজ্যের বিস্তার ঘটেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় নিয়মিত নেশাসেবন চলে, যা দেখে এলাকার সাধারণ মানুষ আতঙ্কে থাকে।

​একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দোকানি বলেন, বিকাল হইলেই ব্রিজের নিচে, মাঠে আর নির্জন রাস্তায় নেশা শুরু হয়। কেউ কিছু বললে ঝামেলা, তাই সবাই চুপ থাকে।

​তথ্য অনুযায়ী, চাঁদখালি–বড়দল (সাতক্ষীরা), বাঁকা সীমান্তবর্তী আশাশুনি (সাতক্ষীরা), দাকোপ–বৈটাঘাটা হয়ে সোনাদানা,.পাটকেলঘাটা (সাতক্ষীরা) হয়ে কাটিপাড়া, এবং সাতক্ষীরা –কেশবপুর–খুলনা রুট হয়ে কপিলমুনি—এই একাধিক পথ ব্যবহার করে একটি শক্তিশালী মাদক সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে এ উপজেলায় মাদক সরবরাহ করছে। এসব রুট মূলত নজরদারি দুর্বল, যোগাযোগ সুবিধাজনক এবং দ্রুত পণ্য সরানোর জন্য উপযোগী হওয়ায় সিন্ডিকেটের কাছে নিরাপদ করিডর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

​অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, পাইকগাছা পৌর সদর, সোনাদানা, বাঁকা, কাটিপাড়া, নতুন বাজার, গদাইপুর ও কপিলমুনি বাজার—এই এলাকা গুলোই বর্তমানে মাদক বেচাকেনার প্রধান হটস্পট। এখান থেকেই খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে গ্রাম-গঞ্জে মাদক ছড়িয়ে পড়ছে, যা তরুণ সমাজকে দ্রুত ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই সিন্ডিকেটের তৎপরতা এতটাই সংগঠিত যে মাঝেমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের আগাম খবরও তারা পেয়ে যায়, ফলে বড় চালান ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

​​সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে কিশোর ও যুবসমাজ। বেকারত্ব, পারিবারিক নজরদারির অভাব ও সহজলভ্যতাই তাদের মাদকের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এক অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন এলাকায় ইয়াবা পাওয়া খুব সহজ। সন্তান নিয়ে আমরা দিশেহারা।

​চিকিৎসকদের মতে, মাদকাসক্তদের মধ্যে মানসিক অবসাদ, অপরাধপ্রেবণতা, পারিবারিক সহিংসতা ও সামাজিক অস্থিরতা দ্রুত বাড়ছে। ছোটখাটো চুরি, ছিনতাই ও সহিংস ঘটনার পেছনেও মাদকের প্রভাব রয়েছে বলে তারা মনে করছেন।

​অনুসন্ধানে জানা গেছে, সীমান্তবর্তী এলাকা ও নদীপথ ব্যবহার করে মাদক পাইকগাছায় প্রবেশ করছে। পরে একটি সংগঠিত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তা খুচরা পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের কিছু লোক জড়িত থাকায় কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না। প্রতিবাদ করলে হুমকি আসে। সামাজিকভাবে চাপ সৃষ্টি করা হয়। তাই সবাই নীরব।

​​পাইকগাছায় মাদক আগ্রাসনের ঘটনায় এখন সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে দু–একজন খুচরা বিক্রেতা বা বাহককে আটক করা হলেও মূল কারবারি ও সিন্ডিকেটের গডফাদাররা বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। ফলে এসব অভিযান অনেকের কাছে লোক দেখানো বলেই মনে হচ্ছে।

​আরও গুরুতর অভিযোগ হলো—কখনো কখনো মাদক সংশ্লিষ্ট দু–একজনকে আটক করা হলে প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের কিছু নেতা-কর্মী প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে তাদের ছাড়িয়ে নিতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতা নিয়ে জনমনে গভীর সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

​স্থানীয়দের প্রশ্ন, পৌর সদর, বাঁকা, কাটিপাড়া, নতুন বাজার, গদাইপুর ও কপিলমুনি বাজারের মতো একাধিক পয়েন্টে যদি প্রকাশ্যেই মাদক কেনাবেচা চলে, তাহলে তা প্রশাসনের চোখ এড়ায় কীভাবে? সংশ্লিষ্ট থানা, গোয়েন্দা সংস্থা ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নিয়মিত নজরদারি থাকা সত্ত্বেও বড় সিন্ডিকেট অক্ষত থাকা কি কেবল দায়িত্বহীনতা, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর কোনো যোগসাজশ—সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে।

​স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, খণ্ড খণ্ড অভিযানের বদলে রুটভিত্তিক বিশেষ অভিযান, রাজনৈতিক চাপমুক্ত তদন্ত এবং সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা না গেলে পাইকগাছাকে মাদকমুক্ত করা সম্ভব নয়।

​এক জনপ্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মাদক একটি সামাজিক ব্যাধি। শুধু পুলিশের পক্ষে এটি নির্মূল করা সম্ভব নয়। সকালের (সবার) এগিয়ে আসা উচিত। তবে নিয়মিত নজরদারি না থাকলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে না।

​পাইকগাছা থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. গোলাম কিবরিয়া বলেন, “মাদকবিরোধী কার্যক্রমের অংশ হিসেবে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। আশা করছি খুব দ্রুত সময়ের মধ্যেই পাইকগাছা থেকে মাদক নির্মূলে দৃশ্যমান অগ্রগতি আসবে। এখন থেকে আরও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে, যাতে মাদক ব্যবসায়ীরা কেউই রেহাই না পায়।”

​রাজনৈতিক চাপের কারণে মাদক মামলার আসামি ছাড় পাওয়ার কোনো ঘটনা ঘটেছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পাইকগাছায় এ ধরনের কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না। কেউ যদি মাদক সংশ্লিষ্ট আসামির পক্ষে সুপারিশ করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধেও প্রচলিত কঠোর আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।​
​বিশেষজ্ঞদের মতে, কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। স্কুল-কলেজভিত্তিক কাউন্সেলিং, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে মাদক ব্যবসার পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় আনতে না পারলে সব উদ্যোগই ব্যর্থ হবে।

​পাইকগাছার মানুষ আজ নিরাপদ সমাজ চায়—যেখানে সন্তানরা মাদক নয়, স্বপ্নের পথে এগোবে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, চায়ের কাপে চুমুকের আড়ালে চলা এই মরণনেশা কবে থামবে? নাকি নীরবতার সুযোগে আরও গভীরে শিকড় গাঁড়বে ভয়ংকর এই মাদক সাম্রাজ্য?