জাগৃকের শর্তের বেড়াজালে আটকা ১২৭ জনের ভাগ্য

রাজধানীর মোহাম্মদপুর হাউজিং এস্টেটের আসাদ এভিনিউতে (গৃহায়ণ কনকচাঁপা) ও সাত মসজিদ রোডে (গৃহায়ণ দোলনচাঁপা) ৪৩০টি আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পে সেখানে আগে থেকে বসবাসরত বৈধ ভাড়াটিয়াদের জন্য ২৫৩টি ফ্ল্যাট সংরক্ষিত রাখে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ (জাগৃক)। সরকার নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে প্রকৃত বসবাসকারীরা হতে পারবেন এসব ফ্ল্যাটের মালিক। এতে বাড়ি ভাড়া পরিশোধ ও ইউটিলিটি বিল পরিশোধের প্রমাণপত্র জমা দেওয়াসহ কিছু শর্ত দেওয়া হয়। জাগৃক থেকে ২৫৩টি ফ্ল্যাট সংরক্ষিত রাখা হলেও পরে বৈধ ভাড়াটিয়া দাবি করে আবেদন করেন ২৫৭ জন। তাই আবেদন গ্রহণের আগে প্রকল্পের প্রসপেক্টাসের শর্ত অনুযায়ী প্রকৃত বসবসারকারী যাচাই করতে একটি কমিটি গঠন করে জাগৃক। কমিটির পর্যালোচনায় শর্ত পূরণ করতে না পারায় আটকে যায় ১২৭ জনের ভাগ্য। আবেদনকারীদের অভিযোগ, প্রকৃত বসবাসকারীদের একটি অংশকে বাদ দিয়ে গৃহায়ণের লোকদের সুবিধা দিতে অযৌক্তিক শর্ত আরোপ করা হয়। কারণ এত বছর আগের কাগজপত্র অনেকের কাছেই ছিল না।
জানা গেছে, প্রকল্পের প্রসপেক্টাসে উল্লেখ করা হয়, ‘প্রকল্প এলাকায় বর্তমানে ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাসকারীদের মধ্যে ফ্ল্যাট প্রাপ্তির জন্য আবেদনকারীদের আসাদ অ্যাভিনিউ ও সাতমসজিদ রোডে ডি-টাইপ কলোনিতে মাসিক ভাড়াভিত্তিক বরাদ্দ প্রাপ্ত ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাসের সপক্ষে বৈধ সাময়িক বরাদ্দপত্র, ভাড়া পরিশোধ ও ইউটিলিটি বিল পরিশোধের (গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ) কাগজপত্রাদি ও অন্যান্য প্রমাণক থাকতে হবে।’ এতে আরও শর্ত দেওয়া হয়, কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের দখলে মাসিক ভাড়াভিত্তিক একাধিক ফ্ল্যাট থাকলেও তিনি বা তারা কেবল মাত্র একটি ফ্ল্যাট বরাদ্দ পাওয়ার যোগ্য হবেন। ভুল তথ্য দিয়ে একাধিক ফ্ল্যাট বরাদ্দ নিলে পরবর্তী সময়ে তা প্রমাণিত হলে সকল ফ্ল্যাটের বরাদ্দ বাতিলসহ জামানত বাজেয়াপ্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এসব শর্তে আটকে যায় ১২৭ জনের ভাগ্য। তাদের কেউ বৈধ সাময়িক বরাদ্দপত্র দেখাতে পারেননি। তাই এই ১২৭ জনের ভাগ্য এখন কর্তৃপক্ষের কৃপার ওপর নির্ভর করছে। তাদের নামে বরাদ্দ দিতে গেলে আগে প্রসপেক্টাস সংশোধন করতে হবে বলে জানা গেছে। কারণ যেসব সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছিল সেটা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ও জাগৃকের বোর্ড সভায় অনুমোদন নিয়ে প্রকাশ করা হয়েছিল। এখন শর্ত শিথিল করতে গেলে নতুন করে প্রসপেক্টাস করতে হবে। এটা জাগৃকের কাজকে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে কর্তৃপক্ষের এই দাবিকে অযৌক্তিক ও দুরভিসন্ধিমূলক হিসেবে দেখছেন মোহাম্মদপুর হাউজিং এস্টেট ডি-টাইপ কলোনি কল্যাণ সমিতি। সমিতির পক্ষ থেকে জাগৃক চেয়ারম্যানের কাছে একটি স্মরকলিপি দেওয়া হয়। সেখানে লিখিতভাবে বলা হয়েছে, ‘মোহাম্মদপুর ডি-টাইপ কলোনিগুলো ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত। জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে জার্মানির একটি এনজিওর কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় স্থানীয় বিভিন্ন কারণে বাস্তুচ্যুত নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য আবাসনের নিমিত্তে একটি রান্নাঘর ও একটি বাথরুম সংবলিত ২০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট প্রতিষ্ঠা করা হয়। যার প্রতিটি বিল্ডিংয়ে ৩৬টি করে ফ্ল্যাট ছিল এবং ৮টি ভবনে মোট ২৮৮টি পরিবার বসবাস করত।
স্মারকলিপিতে কল্যাণ সমিতির দাবি করা হয়, সার্ভে রিপোর্ট এবং ডিপিপি অনুযায়ী ২৮৮টি পরিবারকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রকল্পটি নেওয়ার কথা। কিন্তু ডিপিপি অনুযায়ী যথাযথ অনুসরণ ব্যাতিরেকে প্রসপেক্টাস অনুমোদন করা হয়, যা মূল ডিপিপির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। স্বেচ্ছাচারী ও বেআইনিভাবে প্রসপেক্টাসের বরাদ্দ প্রাপ্তির যোগ্যতা নিরূপণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধারা উপধারা ভিন্ন ভিন্ন এবং বৈপরীত্যমূলকভাবে রাখা হয়েছে। প্রসপেক্টাসের এই বৈপরীত্যমূলক ধারা-উপধারা রাখার অর্থই হলো সেখানকার ক্ষতিগ্রস্ত ২৮৮টি ফ্ল্যাটবাসীকে ফ্ল্যাট না দেওয়ার জাগৃকের কুচক্রী সিন্ডিকেটের সুস্পষ্ট দুরভিসন্ধি।
এ বিষয়ে সমিতির সভাপতি মারগুব আহমেদ নাজাম উদ্দীন বলেন, ‘প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল ২৮৮টি পরিবারকে কেন্দ্র করে; কিন্তু বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জাগৃকের কর্মকর্তা এবং পূর্ত মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে এটাকে আওয়ামী কোটায় ভাগবাটোয়ারা করা হয়। প্রসপেক্টাসে চার বার চার রকম শর্ত দেওয়া হয়। এটার উদ্দেশ্যেই ছিল আমাদের বাদ দেওয়া।’
প্রকল্প এলাকায় মোট ৮টি ভবনে ৪৩০টি বিভিন্ন আয়তনের ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পের মেয়াদ আগামী বছরের জুন পর্যন্ত নির্ধারিত রয়েছে এবং এ বছর ডিসেম্বরের মধ্যেই সব লটারি হতে পারে। এরই মধ্যে সব শর্ত পূরণ করে ১১৮ জন বৈধ ভাড়াটিয়ার নামে ফ্ল্যাট বরাদ্দের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ।
জাগৃক কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রকৃত ভাড়াটিয়া দাবি করা একটা গ্রুপ শর্ত পূরণ না করে নানাভাবে জাগৃক কর্তৃপক্ষকে চাপ দিচ্ছে তাদের নামে বরাদ্দ দেওয়ার জন্য। শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলেও একটা গ্রুপ বিভিন্ন সময় আন্দোলন করে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের প্রধান কার্যালয়ের সামনে মানবন্ধন এবং সরকারি বিভিন্ন সংস্থায় চিঠি দিয়ে চাপ তৈরি করছে। তাতে প্রকল্পের কাজে ধীরগতি নেমে আসতে পারে। অভিযোগ রয়েছে আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারীদের মধ্যে কারও কারও নামে দুটি ফ্ল্যাটের আবেদন রয়েছে। এ অযৌক্তিক দাবি মেটাতেই তাদের আন্দোলন বলে মনে করে জাগৃক কর্তৃপক্ষ।
জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোসা. ফেরদৌসী বেগম বলেন, আমার জানামতে বিষয়টি নিয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছেও তারা আবেদন করেছে। সেখান থেকে যে সিদ্ধান্ত আসবে আমরা সেটা বাস্তবায়ন করব।
এ বিষয়ে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ‘প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের যাচাই-বাছাই করতে সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ইউটিলিটি বিলসহ বিভিন্ন কাগজপত্র পর্যালোচনা করে। ২০২৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বরে প্রসপেক্টাসের শর্ত পূরণ না হওয়ায় কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ১২৭ জনকে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। এই তালিকার ১৫ নম্বরে থাকা মারগুব আহম্মদ নজিম উদ্দিন মানববন্ধনের নেতৃত্ব দেন।
জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ২০২৩ সালের ৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত বৈধ ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে হলফনামাসহ আবেদন সংগ্রহ করা হয়। সেখানে ২৫৭টি আবেদন জমা পড়ে। বৈধ ভাড়াটিয়াদের আবেদন যাচাই-বাছাই করার জন্য ৭ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে কর্তৃপক্ষ। পরে সেগুলো যাচাই-বাছাই করে কমিটি তিন ক্যাটাগরিতে আবেদনগুলো তালিকা করে। কমিটি তালিকায় ক্যাটাগরি ছক-ক তে সঠিক আবেদন ১১৮টি, ছক-খ তে প্রোসপেক্টাসের শর্ত পূরণ হয়নি ১২৭ জন। ছক-গ তে অনিষ্পন্ন আবেদন ১২টি।
এরপর ৭ সদস্যের ওই কমিটি চূড়ান্ত সুপারিশ করে- অনিষ্পন্ন আবেদনের ব্যাপরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সমীচীন মর্মে সকলে একমত পোষণ করেন। আর যেসকল আবেদন সঠিক পাওয়া গেছে তাদের অনুকূলে ফ্ল্যাটের বরাদ্দপত্র জারির সুপারিশ করা হলো।’ কিন্তু শর্ত পূরণ হয়নি যাদের তাদের বিষয়ে কমিটি কোনো মতামত দেয়নি। যেহেতু বরাদ্দপত্র জারির সুপারিশ করেনি তাই সেগুলো বাতিলযোগ্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জাগৃক সূত্রে জানা গেছে, একটি মহল মিথ্যা বৈধ ভাড়াটিয়া সাজিয়ে আবেদন করে তাদের কাছ থেকে অঙ্গীকারনামা নিয়েছেন যদি ফ্ল্যাট পান তাহলে তাকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দিতে হবে। এভাবে ভাড়াটিয়া বা তাদের ওয়ারিশদের খুঁজে বের করেও অনেক আবেদন জমা করানো হয়েছে। কিন্তু যাচাই-বছাইতে টিকতে না পারলেও অনেকের আবেদনের কাগজ বিক্রি করে মোট অঙ্কের অর্থ লেনদেন করার অভিযোগ উঠেছে।
তবে মোহাম্মদপুর ডি-টাইপ কলোনি ভাড়াটিয়া অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বলেছেন, প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা প্রকৃত ভাড়াটিয়াদের বাদ দিতেই প্রোসপেক্টাসে নানা শর্ত জুড়ে দেন। বহুবছর পুরনো অনেকের বিদুৎ, গ্যাসের বিলের কাগজ হারিয়ে গেছে তাই সেটা জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি। কিন্তু জাগৃকের এক শ্রেণির সুবিধাভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারী নিজেদের নামে ফ্ল্যাট নিতেই প্রকৃত ভাড়াটিয়া বা বসবাসকারীদের বাদ দিতে এই শর্ত দিয়েছে।
জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের ঢাকা ডিভিশন-২ (মোহাম্মদপুর ডিভিশন) কর্মরত একজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী ও কর্মকর্তা-কর্মচারী বেশ কয়েকজন ক্ষতিগ্রস্তের কাছ থেকে ৩০০ টাকার স্ট্যাাম্পে কাগজ কিনে রেখেছেন। শর্ত ছিল ফ্ল্যাট পেলে তাদের কাছে বিক্রি করতে হবে।
জানা গেছে, প্রকল্পের প্রথমদিকের প্রকল্প পরিচালকসহ জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের অনেক কর্মকর্তার নামেই এই প্রকল্পে ফ্ল্যাট রয়েছে। এমনকি সংস্থাটির সাবেক চেয়ারম্যান দায়িত্বে থাকাকালীন একটি ফ্ল্যাট বরাদ্দ নিয়েছেন।
অনিষ্পন্ন আবেদন কোন ভবনে কতটি : ডি-টাইপ ভবন-১ মোট আবেদন ৩৪টি। এখানে কোনো অনিষ্পন্ন নাই। ভবন-২-এ মোট আবেদন ৩৩টি ও অনিষ্পন্ন ২টি। ভবন-৪-এ মোট আবেদন ৩৩টি ও অনিষ্পন্ন ৩টি। ভবন-৬-এ মোট আবেদন ২৮টি, যাতে অনিষ্পন্ন নাই। ভবন-৭-এ মোট আবেদন ৩৫টি, কোনো অনিষ্পন্ন নাই। ভবন-৮ মোট আবেদন ৩৫টি কোনো অনিষ্পন্ন নাই। মোট আবেদন ২৫২টি।