জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের উপসহকারী প্রকৌশলী মোঃ শরাফত হোসেনকে ডাবল প্রমোশন দিয়ে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পদে মিরপুরে ‘প্রাইজ পোস্টিং’ দেওয়ার ঘটনায় সংস্থাটির ভেতরে-বাইরে তীব্র আলোচনা ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তার বিরুদ্ধে মাদকাসক্তি, দুর্নীতি, সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ, টেন্ডার অনিয়মসহ নানা গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তাকে দ্রুত পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন দেওয়া হলো—তা নিয়ে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, শরাফত হোসেন ২০০৬ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত রাজশাহী ডিভিশনে উপসহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত থাকাকালে মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন। রাজশাহীর সফুরা হাউজিং এস্টেটে দায়িত্ব পালনকালে তিনি স্থানীয় মাদক বিক্রির সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সূত্র দাবি করে, সে সময় তিনি অফিসের আইপিএস ব্যাটারি, কম্পিউটারসহ সরকারি মালামাল চুরি করে বিক্রি করতেন এবং সেই অর্থে মাদক সেবন করতেন। মাদক সেবন ও বিক্রির অভিযোগে রাজশাহীর ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের ভাদ্রা বস্তি এলাকা থেকে তাকে দুইবার আটকও করে পুলিশ।
এছাড়া, সরকারি অনুমতি ছাড়া অফিস কম্পাউন্ডের গাছ কেটে বিক্রি করা, সেই অর্থ আত্মসাৎ করা এবং নিজের বাসার জন্য ফার্নিচার তৈরির অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের জিম্মি করে মোটা অংকের টাকা আদায়, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার স্বাক্ষর জাল করে ফাইল অনুমোদন, ভুয়া ব্যাংক চালান তৈরি করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ—এসব অভিযোগও একাধিকবার উঠেছে।
২০১৪ সালে একটি প্লটের ওয়ারিশসূত্রে নামজারি সংক্রান্ত মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদনের জন্য এক জেলা জজের কাছে দুই লাখ টাকা ঘুষ দাবি করলে তাকে প্রকাশ্যে কান ধরে উঠবস করানো হয় বলে জানা যায়। পরে নির্বাহী প্রকৌশলীর হস্তক্ষেপে তিনি মুচলেকা দিয়ে রেহাই পান।
এসব অনিয়মের কারণে ২০১৫ সালে তাকে রাজশাহী থেকে বরিশালে বদলি করা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ে প্রভাব খাটিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ঢাকার প্রধান কার্যালয়ের সমন্বয় ও উন্নয়ন শাখায় বদলি হয়ে আসেন।
ঢাকায় দায়িত্ব পালনকালে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা পুনর্বাসন প্রকল্পসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের বাজেট, প্রাক্কলন, ভেরিয়েশন ও টেন্ডার অনুমোদনের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, ভেরিয়েশনের পূর্বানুমতি ছাড়াই ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ঠিকাদারদের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে প্রাক্কলনের মূল্য বাড়িয়ে অনুমোদন করাতেন। অনেক ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার স্বাক্ষর জাল করে ফরওয়ার্ডিং তৈরি করে কাজ সম্পন্ন করার ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা যায়।
এছাড়া, বিভিন্ন প্রকল্পের অনুমোদিত প্রাক্কলন টেন্ডারের আগেই ঠিকাদারদের কাছে বিক্রি করে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তার এসব কর্মকাণ্ড নজরে আসায় তৎকালীন চেয়ারম্যান তার কক্ষে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করেন। ফুটেজে দেখা যায়, অফিস সময় শেষে তিনি বাইরের ব্যক্তিদের নিয়ে কক্ষে মাদক সেবন করছেন।
২০১৯ সালে পুনরায় তাকে বরিশালে বদলি করা হলে তার কক্ষ থেকে ফেনসিডিলের বোতল ও গাঁজার প্যাকেটসহ বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয় বলে জানা যায়। তবে তিনি নির্ধারিত সময়ে যোগদান না করে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন এবং পরে প্রায় ১৬ দিন পর বরিশালে যোগদান করতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয় এবং পদোন্নতি স্থগিতের সুপারিশ করা হয়।
কিন্তু ২০২০ সালে প্রশাসনিক পরিবর্তনের পর পুনরায় ঢাকায় ফিরে এসে আগের পদে বহাল হন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি অনুমতি ছাড়াই মিরপুরের এসওএস সরকারি কোয়ার্টার নং-০৪-এ প্রায় ১৮ মাস বসবাস করেন, ফলে সরকারের প্রায় তিন লাখ টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়। পরবর্তীতে কোয়ার্টার নং-০৬ বরাদ্দ নেওয়ার পরও দুটি কোয়ার্টারই তার দখলে রয়েছে বলে জানা যায়। এমনকি কোয়ার্টার নং-০৪-এ রাতে মাদকের আসর বসানোর অভিযোগও রয়েছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, কোনো কাজ না করিয়ে রিপেয়ারিং বাবদ বিপুল অংকের টাকা আত্মসাৎ করেছেন তিনি।
এরই মধ্যে ২০২৫ সালের ২ জুন তাকে সহকারী প্রকৌশলী এবং মাত্র ছয় মাসের মধ্যে ২৪ ডিসেম্বর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এরপর ২০২৬ সালের ৭ জানুয়ারি মিরপুর গৃহসংস্থান উপবিভাগ-১ এ তাকে ‘প্রাইজ পোস্টিং’ দেওয়া হয়। বদলির পর তার কক্ষ পরিষ্কার করতে গিয়ে ৯টি ফেনসিডিলের বোতল পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।
সর্বশেষ, ৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে একটি চলমান টেন্ডারের অনুমোদিত প্রাক্কলন জোরপূর্বক নিয়ে ফটোকপি করে বিভিন্ন ঠিকাদারের কাছে বিক্রির অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়েছে। পাশাপাশি বিল নথি ফাঁসের ঘটনাও ঘটেছে, যা অফিসে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
১৫ এপ্রিল ও ২০ এপ্রিল তারিখে পৃথকভাবে তার বিরুদ্ধে দপ্তরীয় অনিয়ম, দায়িত্বে অবহেলা এবং প্রকল্প বিলম্বের অভিযোগ তুলে চিঠি দেওয়া হয়েছে কর্তৃপক্ষকে। তবে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, “তিনি মিরপুরে আসার পর অফিসে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। নিয়মিত মাদক সেবনসহ নানা অনিয়ম করছেন।”
অভিযোগ রয়েছে, ডাবল প্রমোশন ও এই পদায়নের জন্য তিনি প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের এক কর্মকর্তাকে মোটা অংকের অর্থ ও অন্যান্য সুবিধা দিয়েছেন বলেও আলোচনা রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও মোঃ শরাফত হোসেন ফোন রিসিভ করেননি।
এতসব অভিযোগের পরও তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। তারা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত ও ডোপ টেস্টের মাধ্যমে সত্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন।
সম্পাদক : মাহমুদুল হাসান, বার্তা সম্পাদক: এ এইচ সুমন
oporadhkantho@gmail.com
Copyright © 2026 অপরাধ কণ্ঠ. All rights reserved.