
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের কার্যকারিতা নিয়ে কড়া সমালোচনা করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি মন্তব্য করেছেন যে, এই সংসদের কোনো মূল্য নেই এবং এটি পাঁচ বছর টিকে থাকবে কি না, তা নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে এক লিফলেট বিতরণ ও গণসংযোগ কর্মসূচিতে তিনি এসব কথা বলেন। মূলত নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের প্রতিবাদে আগামী ৩০ অক্টোবর এনসিপির ডাকা বিক্ষোভ সমাবেশ সফলের আহ্বান জানাতেই তিনি এই কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছিলেন।
নাহিদ ইসলামের দাবি, ১৬ বছর পর গঠিত বর্তমান জাতীয় সংসদ এখন কার্যত বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার একটি সংস্থায় পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, এখানে জনগণের আকাঙ্ক্ষার কোনো জায়গা নেই এবং বিরোধী দলের বক্তব্য বা সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বরকে কোনো গুরুত্বই দেওয়া হচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা তো সংসদে আপনাদের কথা বলার জন্যই গিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে কথা বলার সুযোগ না থাকায় আমরা আবারও রাজপথে ফিরে এসেছি।’ নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘১৬ বছর পরে যে সংসদ নির্বাচন হয়েছে, যেই নতুন জাতীয় সংসদ গঠিত হয়েছিল এই সংসদের মূল্য আর দুই আনাও নাই। সেখানে যেহেতু আমরা বলতে পারছি না, আমরা আবারও রাজপথে এসে দাঁড়িয়েছি।
বর্তমান সরকারকে ‘গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী’ আখ্যা দিয়ে এনসিপি নেতা বলেন, সরকার গঠনকারী দল বিএনপির নেতারা ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পাশে থাকলেও, বিগত দীর্ঘ সময় তারা আওয়ামী লীগের সাথে আপসে ছিল। ফলে তাদের মধ্যে রাষ্ট্র পরিবর্তনের কোনো মানসিকতা তৈরি হয়নি। তিনি দাবি করেন, ২০২৬ সালে নির্বাচনের নামে যে প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে, তা জনগণের সঙ্গে প্রতারণা। ভোটাররা নির্বাচনের মাধ্যমে যে সংস্কার ও পরিবর্তনের আশা করেছিলেন, বর্তমান সরকার জুলাই সনদ এবং গণভোটের রায়কে অস্বীকার করে তা বিসর্জন দিয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। কিন্তু তাদের রাজনৈতিক নেতারা বিগত ১৬-১৭ বছর ধরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আপসে ছিলেন। যদিও বর্তমান সরকারে যারা রয়েছে বিএনপি, তারা সেই সময় গণঅভ্যুত্থানে সঙ্গে ছিল। গত ৭-৮ মাসে তারা কোনো পরিবর্তন করেননি।’। গণভোট ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রসঙ্গ তুলে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘২০২৬ সালে যে নির্বাচন হয়েছে, সেই নির্বাচনে আপনারা দুটি ভোট দিয়েছিলেন। সেই গণভোটে আপনারা-আমরা সবাই মিলে হ্যাঁ ভোট দিয়েছিলাম। কিন্তু আপনারা দেখেছেন, নির্বাচনের পর যেইমাত্র ক্ষমতায় এসেছে— তারা জুলাই সনদকে অবজ্ঞা করেছে, গণভোটকে অস্বীকার করেছে। যারা জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষাকে ভুলিয়ে-মিশিয়ে দিয়ে বাংলাদেশকে পুরোনো বন্দোবস্তে নিয়ে গেছে। যদি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হয়, যদি সংস্কার বাস্তবায়ন না হয়, যদি দেশে বৈষম্য দূর না হয়, যদি চাঁদাবাজি-সন্ত্রাস দূর না হয়, তাহলে শেখ হাসিনা কী দোষ করেছিলেন, এটা কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ এখন বলতে শুরু করেছে।’।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সমালোচনা করে নাহিদ বলেন, শেখ হাসিনা ও তারেক রহমানের মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। তারেক রহমানও শেখ হাসিনার মতো অবৈধভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে রেখেছেন এবং দেশের ভোটাধিকার হরণ করেছেন। তিনি বলেন, এভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে দেশটিকে মাফিয়াদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, যার প্রতিফলন সারা দেশে আজ দৃশ্যমান।
জ্বালানি তেলের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, বর্তমানে সরকারি হিসেবে এলপিজি গ্যাসের দাম ১ হাজার ৮০০ টাকা হলেও, খোলা বাজারে ভোক্তাদের তা কিনতে হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকায়। অথচ নির্বাচনের পর এই দাম ছিল ১ হাজার ২০০ টাকা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বিশ্বযুদ্ধের পরিস্থিতির মতো প্রতিকূলতা থাকলেও তখনকার তুলনায় বর্তমান পরিস্থিতি অনেক বেশি অস্থিতিশীল বলে তিনি দাবি করেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিশ্বযুদ্ধ পরিস্থিতি ছিল, পুলিশের ভঙ্গুর অবস্থা ছিল।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তা এখন আর নেই। তিনি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন যে, এই প্রতিবেদনের দিন সকালেও গায়ক আসিফ আকবরের গাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। বর্তমান সরকার ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন বলেও তিনি মন্তব্য করেন। ছাত্রদলের বহু নেতাকর্মী আহত ও নিহত হয়েছেন। অর্থাৎ আপনি সমাজের যে স্তরের নাগরিকই হন না কেন, এই রাষ্ট্রে আপনার নিরাপত্তা নেই।
সম্পাদক : মাহমুদুল হাসান, বার্তা সম্পাদক: এ এইচ সুমন
oporadhkantho@gmail.com
Copyright © 2026 অপরাধ কণ্ঠ. All rights reserved.