
যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ঘিরে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ওয়াশিংটনের সাথে অনেক দেশের সম্পর্ক জটিল হয়ে পড়লেও পাকিস্তান এক্ষেত্রে কিছুটা ব্যতিক্রম। নিউইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর মন্তব্য করেন, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অনেক দেশের সম্পর্কের রসায়ন আগের চেয়ে কঠিন হয়ে পড়েছে। নিউইয়র্কে গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে প্রবাসী ভারতীয় ও নীতিনির্ধারণী বিশেষজ্ঞদের এক অনুষ্ঠানে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে ওয়াশিংটনের সঙ্গে দিল্লির সম্পর্ক কোন কোন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। জবাবে জয়শঙ্কর বলেন, ‘আমি যদি একটু দূর থেকে সম্পর্কটির দিকে তাকাই, তাহলে দেখব, বিশ্বের অনেক দেশেরই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক আগের চেয়ে কঠিন হয়ে উঠেছে। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের অস্থির সময়ে শুল্ক আরোপ ও ইরান যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। হামলার শিকার হলে ওয়াশিংটনের সহায়তা পাওয়া যাবে কিনা, তা নিয়েও তাদের অনিশ্চয়তা বাড়ছে। দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মার্কিন মিত্রদেশগুলোর নেতারাও ট্রাম্পের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন, অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগতভাবেও। কিন্তু এই অস্থিরতার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একসময় গভীর সংকটে থাকা সম্পর্ককে অংশীদারত্বে রূপ দিতে পেরেছে পাকিস্তান। আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্প ও তার দলের সাফল্য কামনা করবে এমন দেশগুলোর একটি পাকিস্তান। প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে এবং পরে জো বাইডেন পাকিস্তানের সমালোচনায় কঠোর ভাষা ব্যবহার করেন। পাকিস্তানের জন্য এখন মূল প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে নিজেদের অবস্থান কীভাবে ধরে রাখা যায়।
এরই মধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি জনসমর্থন নিম্নমুখী। পিউ রিসার্চ সেন্টারের গত ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবরের জরিপ অনুযায়ী, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার হার দাঁড়িয়েছে ৩০ শতাংশে, যা জানুয়ারিতে ছিল ৩৭ শতাংশ। রিপাবলিকান পার্টির হাত থেকে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে ট্রাম্পের এই অস্থির রাজনৈতিক সময়ের মধ্যেও পাকিস্তান কৌশলগতভাবে হোয়াইট হাউসের সাথে নিজেদের সম্পর্ক সুসংহত রাখতে সক্ষম হয়েছে, যদিও নিজ দেশে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমন ও সামরিক শাসনের আধিপত্য নিয়ে দেশটির সরকারের সমালোচনা রয়েছে। অথচ পাকিস্তানের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন এবং কার্যত সামরিক শাসন পাকাপোক্ত করার অভিযোগে দেশটির সরকারের সমালোচনা বাড়ছে। অন্যদিকে, আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি তৎকালীন আফগান তালেবানের প্রতি পাকিস্তানের সমর্থন নিয়ে ওয়াশিংটনে সন্দেহ তৈরি হয়েছিল।
দুই দেশের সম্পর্কের এই পরিবর্তনের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে ২০২৫ সালের মে মাসের ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত সংঘাত। কাশ্মীরে ২৬ জন পর্যটক নিহতের ঘটনায় দুই দেশের চার দিনের তীব্র যুদ্ধের অবসান ঘটে ১০ মে। ট্রাম্প এই যুদ্ধবিরতির কৃতিত্ব দাবি করলেও ভারত তা প্রত্যাখ্যান করে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার কথা জানায়। এর আগে ২০২৫ সালের মার্চে কাবুল বিমানবন্দর হামলায় জড়িত সন্দেহভাজন গ্রেপ্তারে সহায়তা করায় কংগ্রেসে পাকিস্তানকে সরাসরি ধন্যবাদ জানান ট্রাম্প। এরপর থেকে পাকিস্তানের শুল্ক সুবিধা বাড়ানোসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইসলামাবাদকে বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছে ওয়াশিংটন। তবে দ্বিতীয় মেয়াদের মাত্র দুই মাসের মাথায়, ২০২৫ সালের মার্চে, কাবুল বিমানবন্দরের অ্যাবে গেট এলাকায় ২০২১ সালের বোমা হামলার এক সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তারে সহায়তা করায় কংগ্রেসে দেয়া ভাষণে পাকিস্তানকে ধন্যবাদ জানান ট্রাম্প। ভারতশাসিত কাশ্মীরে সশস্ত্র হামলায় ২৬ জন পর্যটক নিহত হওয়ার পর ভারত ও পাকিস্তান চার দিনের তীব্র যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ট্রাম্প বারবার এই সম্পর্কের প্রশংসা করছেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা তলানিতে নেমে আসে।
ইসলামাবাদভিত্তিক সানোবার ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক কামার চিমার মতে, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোতে পাকিস্তান এখন একটি অপরিহার্য পক্ষ। জুলাই মাসে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তিতে পাকিস্তানি পণ্যের শুল্ক ২৯ শতাংশ থেকে ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। এছাড়া খনিজসম্পদ, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ড্রোনের মতো প্রযুক্তিতে মার্কিন কোম্পানিগুলোর সাথে পাকিস্তানের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। তবে ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইমরান খান মনে করেন, ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব ছাড়া সরাসরি বড় কোনো অর্থনৈতিক সুবিধা পাকিস্তান খুব একটা পায়নি। ইউরোপ থেকে মধ্যপ্রাচ্য, এমনকি পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভরশীল মিত্ররা এখন বিকল্প অংশীদারত্ব গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনাইটেড স্টেটস ইনস্টিটিউট অব পিসের পাকিস্তানবিষয়ক সাবেক পরিচালক ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ইমরান খান বলেন, ট্রাম্পের সঙ্গে ইসলামাবাদের ঘনিষ্ঠতা পাকিস্তানের কূটনৈতিক গুরুত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। তবে তিনি বলেন, ‘একই সঙ্গে বলা যায়, কিছু অমূর্ত সুবিধা-যেমন কূটনৈতিক পরিচিতি ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব-ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে পাকিস্তান সরাসরি তেমন কিছু অর্জন করেনি।’।
নির্বাচনের পরবর্তী প্রভাব নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন বুসোল মন্ডিয়ালের নির্বাহী পরিচালক গ্রেস ওয়ার্মেনবল। তার মতে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল কেবল বর্তমান মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিকেই প্রভাবিত করবে না, বরং ২০২৮ বা ২০২৯ সালের হোয়াইট হাউসের সম্ভাব্য ক্ষমতার পরিবর্তনেরও ইঙ্গিতবাহী হতে পারে। ডেমোক্র্যাটরা জয়ী হলে তারা ন্যাটোর মতো দীর্ঘমেয়াদী মিত্রদের পাশাপাশি ভারতের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। ঐতিহ্যগত মার্কিন মিত্রদের সঙ্গে কয়েক দশকের আস্থার সম্পর্কেও ফাটল ধরেছে। কংগ্রেসের নির্বাচনে ট্রাম্পের পরীক্ষা মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ঐতিহাসিকভাবে নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।
ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রভাব কমে গেলে পাকিস্তানের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে কি না, তা নিয়েও বিতর্ক চলছে। কামার চিমার মতে, ট্রাম্পের প্রভাবের ওপর ভিত্তি করে পাকিস্তানের নীতিনির্ধারণ করা ঠিক হবে না। বরং দেশটির প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে তাদের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের গুরুত্বের ওপর। ইমরান খান মনে করেন, স্বল্প মেয়াদে পরিস্থিতি হয়তো খুব একটা বদলাবে না, তবে এই নির্বাচন পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক গুরুত্বের মোড় পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে।
সম্পাদক : মাহমুদুল হাসান, বার্তা সম্পাদক: এ এইচ সুমন
oporadhkantho@gmail.com
Copyright © 2026 অপরাধ কণ্ঠ. All rights reserved.