
ব্রাজিলের বামপন্থি প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা নির্বাচনী জয়ের পরপরই এক কড়া বার্তা দিয়েছেন ওয়াশিংটনকে। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ব্রাজিল কারও পেছনের উঠান হিসেবে গণ্য হওয়া মেনে নেবে না। একজন সাবেক ইউনিয়ন নেতা হিসেবে প্রভাবশালী শক্তির বিরুদ্ধে মাথা নত না করার যে ভাবমূর্তি তার রয়েছে, এই ঘোষণা তার সেই রাজনৈতিক অবস্থানেরই প্রতিফলন। সাধারণত পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে নির্বাচনী প্রচারে জয় পাওয়া কঠিন হলেও, মার্কিন হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে লুলার এই অবস্থান ব্রাজিলীয়দের মধ্যে দেশপ্রেমের জোরালো সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়েছে।
লুলার এই কঠোর অবস্থানের বিপরীতে ডনাল্ড ট্রাম্প কিছুটা কৌশলী প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। ট্রাম্প দাবি করেছেন তিনি লুলাকে পছন্দ করেন এবং তাদের মধ্যে ভালো সম্পর্ক রয়েছে, এমনকি তিনি কোনো প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেননি বলেও মন্তব্য করেন। তবে একই সাথে ট্রাম্প ব্রাজিলের এই নির্বাচনকে কারচুপিপূর্ণ ও ভয়ানক বলে সমালোচনা করতে ছাড়েননি। এদিকে লুলার প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারো এখনো পরাজয় স্বীকার করেননি, যদিও ব্রাজিলের নির্বাচনী আদালত বা তার নিজস্ব দল কোনো অনিয়মের প্রমাণ পায়নি। ট্রাম্পের সঙ্গে লুলার সম্পর্ক গত এক বছরে অনেকটাই শীতল। লুলা সরাসরি জানিয়েছেন যে ট্রাম্পের সঙ্গে তার কোনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক নেই এবং তাকে ফোন করার কোনো ইচ্ছেও নেই তার। এর আগে জাইর বলসোনারোর অভ্যুত্থান চেষ্টার বিচারের প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্পের আরোপিত শুল্কের কড়া জবাব দিয়ে লুলা নিজ দেশের সমর্থন পেয়েছিলেন। ফ্লাভিও এখনও নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তার এই বার্তার সরাসরি লক্ষ্য ছিল ওয়াশিংটন। অন্যান্য মার্কিন মিত্রদের মতো সতর্ক পথ না মাড়িয়ে লুলা এর কড়া জবাব দিয়েছিলেন এবং এতে তিনি সফলও হন। তিনি ব্রাজিলের সার্বভৌমত্বের কথা তুলে ধরে জ্বালাময়ী ভাষণ দেন এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় মার্কিন হস্তক্ষেপের সমালোচনা করেন। সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হলেও লুলার আগামী চার বছরের মেয়াদে বেশ কয়েকটি বিষয় উত্তেজনা নতুন করে উসকে দিতে পারে।
বর্তমানে লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে এক ধরনের মেরুকরণ দেখা যাচ্ছে। ইকুয়েডর, চিলি, কলম্বিয়া, আর্জেন্টিনা ও পেরুতে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠরা ক্ষমতায় আসায় তিনি এই অঞ্চলে ‘ডনরো ডকট্রিন’ নাম দিয়ে মার্কিন আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছেন। চ্যাথাম হাউসের বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টোফার সাবাতিনি মনে করেন, ফ্লাভিও বলসোনারোর পরাজয় ট্রাম্পের জন্য বড় ধাক্কা, কারণ ব্রাজিলকে তিনি তার দশম বড় ভূ-রাজনৈতিক অর্জন হিসেবে দেখেছিলেন। এর পাশাপাশি মাদকবিরোধী জোট ‘শিল্ড অব আমেরিকাস’ এবং চীনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম রেয়ার আর্থ মিনারেলের মজুত ব্রাজিলে থাকায় দেশটির ওপর মার্কিন নজর ক্রমশ বাড়ছে। লাতিন আমেরিকা সম্প্রতি ডানপন্থি রাজনীতির দিকে ঝুঁকেছে।
আগামী দিনগুলোতে লুলা সরকারের সঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের উত্তেজনার পারদ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে ব্রাজিল অভিযোগ করেছিল, যুক্তরাষ্ট্র তাদের নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করার চেষ্টা করছে। এ ঘটনার জেরে দুই মার্কিন কর্মকর্তার ভিসা বাতিল করে ব্রাজিল এবং তার পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ওয়াশিংটনও ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূতের ভিসা বাতিল করে। এছাড়া ভেনিজুয়েলার নিকোলাস মাদুরোর ওপর মার্কিন পদক্ষেপের বিরোধিতা এবং ব্রাজিলের অপরাধী চক্রকে মার্কিন সরকারের সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে স্বীকৃতির বিষয়টি লুলার তীব্র ক্ষোভের কারণ হয়েছে।
বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও দ্বিমুখী অবস্থান স্পষ্ট। ব্রাজিলের নিজস্ব তাৎক্ষণিক পেমেন্ট ব্যবস্থা ‘পিক্স’ ভিসা ও মাস্টারকার্ডের ব্যবসার ক্ষতি করছে বলে মনে করে যুক্তরাষ্ট্র। রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও বলসোনারোর সমর্থকদের প্রকাশ্য মার্কিন পতাকা প্রদর্শন দুই দেশের মেরুকরণকে সামনে এনেছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র চীনের পর ব্রাজিলের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার হলেও, দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মার্কিন হস্তক্ষেপের মাত্রা ও লুলার প্রতিক্রিয়া ভবিষ্যতে এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের স্থায়িত্ব নির্ধারণ করবে। সাধারণত পররাষ্ট্রনীতির ওপর ভিত্তি করে অভ্যন্তরীণ নির্বাচনে জয়লাভের ঘটনা বিরল, আর এই নির্বাচনও তার ব্যতিক্রম ছিল না।
সম্পাদক : মাহমুদুল হাসান, বার্তা সম্পাদক: এ এইচ সুমন
oporadhkantho@gmail.com
Copyright © 2026 অপরাধ কণ্ঠ. All rights reserved.