
সৌদি আরবে বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় সৃষ্ট প্রতিক্রিয়ার আবহে দেশটিতে কর্মরত নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিয়ে জনমনে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রায় এক লাখ ৭২ হাজার নারী কর্মী বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। এর মধ্যে সিংহভাগ, অর্থাৎ প্রায় এক লাখ ২০ হাজার নারী কর্মী কাজের সন্ধানে সৌদি আরবে গিয়েছেন। জর্ডানসহ অন্যান্য গন্তব্যের তুলনায় সৌদি আরবে নারী কর্মী পাঠানোর হার অনেক বেশি হলেও দীর্ঘকাল ধরে সেখানে তাদের নিরাপত্তা ও অধিকারের বিষয়টি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এরপরেও দেশটিতে বাংলাদেশি নারীকর্মীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ থামেনি। গ্রামের সহজ সরল মেয়েদের অনেকে সেখানে গিয়ে বিপদের মুখে পড়লো। এদের অধিকাংশই ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে দেশে ফিরে গিয়েছেন।
চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেড় হাজারের বেশি নারী কর্মী দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন, যাদের মধ্যে প্রায় এক হাজার জনই সৌদি আরব থেকে ফিরেছেন। ফিরে আসা কর্মীদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা ও অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) চেয়ারপারসন শাকিরুল ইসলাম জানান, প্রতি বছর কতজন নারী কর্মী বিদেশ থেকে ফিরে আসছেন, তার কোনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায় না। তবে তাদের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ফিরে আসা নারীদের মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশই শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এছাড়া বকেয়া বেতন না পাওয়া এবং যৌন হয়রানি তাদের প্রত্যাবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ‘যারা ফিরে এসেছেন তাদের নিয়ে গত বছর জুলাইয়ে করা গবেষণায় আমরা দেখেছি যে ৯০ ভাগই ফিরে এসেছেন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের কারণে। কিন্তু গত দশকের শুরু থেকে বিপুল সংখ্যক নারী শ্রমিক নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরে আসার ঘটনায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়ার প্রেক্ষাপটে ২০১৫ সালে দুই দেশ গৃহকর্মী নেওয়ার বিষয়ে চুক্তিটি করেছিল। দুই বছরের চুক্তিতে যাওয়া নারী গৃহকর্মীরা মাসে সৌদি মুদ্রায় ৮০০ রিয়াল বেতন পাওয়ার কথা এবং চুক্তিতে বলা হয়েছিল গৃহকর্মীরা বিনা খরচে সৌদি আরবে যেতে পারবেন। গৃহকর্মী পাঠানোর আগে সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে জানানো ও সেখানকার বাসাগুলোর আধুনিক উপকরণ ব্যবহারে দক্ষ করার কথা বলেছিলাম আমরা। কিন্তু এজেন্সিগুলোর কারণে সেটি গুরুত্ব পায়নি। ওদিকে শ্রীলঙ্কার শ্রম মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে গত দোসরা সেপ্টেম্বর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শ্রীলঙ্কার গৃহকর্মীদের জন্য উচ্চ বেতন, উন্নত জীবনযাত্রার মান এবং শ্রম অধিকার নিশ্চিত করার সম্ভাবনা নিয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করছে দেশটির সরকার। বাংলাদেশিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেয়নি সৌদি আরব।
সৌদি আরবে নিয়োগ পাওয়া নারী কর্মীদের সুরক্ষায় বর্তমান ব্যবস্থা নিয়ে জানতে চাইলে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, তারা নিয়মিত সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এ বিষয়ে সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছেন।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই সুরক্ষা কাঠামো যথেষ্ট নয়।
সৌদি আরবে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহর মতে, এক দশক আগে গৃহকর্মী নিয়োগ সংক্রান্ত যে চুক্তি হয়েছিল, তাতে কর্মীদের সুরক্ষা ও অধিকারের বিষয়টি যথাযথভাবে উঠে আসেনি। প্রশিক্ষণহীন কর্মীদের গ্রামাঞ্চল থেকে সরাসরি পাঠানোর ফলে তাদের বিদেশের পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিতে বেগ পেতে হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সৌদি আরবের 'ভিশন ২০৩০' প্রকল্পের আওতায় শ্রম আইনের বেশ কিছু সংস্কার আনা হয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সৌদি প্রেস এজেন্সির তথ্যানুযায়ী, গৃহকর্মী ও সমপর্যায়ের কর্মীদের নিয়োগবিধিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। সংশোধিত নিয়মে নিয়োগকর্তারা কোনো কর্মীকে চুক্তির বাইরের কাজ করতে বাধ্য করতে পারবেন না। এছাড়া তৃতীয় কোনো পক্ষের কাজ করানো বা কর্মীদের স্বাস্থ্য ও মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয় এমন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত করাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নিয়োগকর্তা পরিবর্তন এবং বিমা কর্মসূচির মতো সুযোগগুলোকেও সংস্কারের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সৌদি প্রেস এজেন্সি বলেছিল, সৌদি আরব গৃহকর্মী ও সমপর্যায়ের কর্মীদের নিয়োগসংক্রান্ত বিধিমালা সংশোধন করেছে।
২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর সৌদি আরবের মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রী আহমেদ আল-রাজহি এবং বাংলাদেশের তৎকালীন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল একটি শ্রমিক নিয়োগ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। সে সময় বলা হয়েছিল, এই চুক্তির মাধ্যমে একটি নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরি হবে, যা কর্মী ও নিয়োগকর্তা উভয়ের অধিকার রক্ষা করবে। ঐতিহাসিকভাবে ১৯৭৬ সাল থেকে সৌদি আরবে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক পাঠানো শুরু হয় এবং বর্তমানে প্রায় ৩০ লাখ বাংলাদেশি সেখানে কর্মরত আছেন, যা দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। এর আওতায় কর্মী ও নিয়োগকর্তা—উভয়ের অধিকার সুরক্ষা এবং তাদের মধ্যকার চুক্তিভিত্তিক সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করা হবে। এসব পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে মানসম্মত কর্মচুক্তি, মজুরি সুরক্ষা ব্যবস্থা ও বিমা কর্মসূচি, অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং নির্যাতন বা বিধিবিধান লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তা পরিবর্তনের সুযোগ।
নারী কর্মীদের নিপীড়নের বিষয়টি দীর্ঘদিনের। ২০১১ সালে ইন্দোনেশিয়া নারী শ্রমিক পাঠানো বন্ধ করলে সৌদি আরব ফিলিপিন্স, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের পাশাপাশি বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। তখন শ্রীলঙ্কা ও নেপাল মাসিক ১৭০০ রিয়ালের নিচে কর্মী পাঠাতে অস্বীকৃতি জানালেও বাংলাদেশ ৮০০ রিয়ালেই চুক্তি করতে রাজি হয়েছিল। সাবেক রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহর মতে, প্রশিক্ষণ এবং ভাষাগত দক্ষতার অভাবই সমস্যার মূল কারণ। তিনি ফিলিপিন্সের মতো ডরমিটরিভিত্তিক আবাসন ব্যবস্থা চালুর চেষ্টা করলেও তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। সৌদি আরবে বাংলাদেশি নারী কর্মীদের নিপীড়নের প্রবণতা কমানো যাচ্ছে না কেন এমন প্রশ্নের জবাবে রিয়াদ ও জেদ্দায় বাংলাদেশ দূতাবাসের সূত্রগুলো বলছে, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ বা দক্ষতা নেই এমন নারীদের বেশি পাঠানোর কারণেই সংকট বেড়েছে। আবার এজেন্টরা অজপাড়াগাঁও থেকে মেয়েদের এনে কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই সৌদিতে পাঠানো শুরু করলো। পরে বাংলাদেশ নারী কর্মীদের নিপীড়নের বিষয়টি সামনে আনলে ২০১৯ সালের আগস্টে তখনকার সৌদি শ্রম ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রতিনিধিদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এরপর কর্তৃপক্ষ নারীদের সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
আন্তর্জাতিক সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ৯ জুলাই প্রকাশিত প্রতিবেদনে সৌদি আরবে ফিলিপিন্সের গৃহকর্মীদের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ, শোষণ এবং যৌন নিপীড়নের চিত্র তুলে ধরেছে।
ভুক্তভোগী ১৯ জন নারীর অভিজ্ঞতা সম্বলিত এই প্রতিবেদনে তারা জানিয়েছে, নিয়োগকর্তার বাড়িতে প্রবেশের পর তারা প্রায়শই অসহায় হয়ে পড়েন। ‘একবার যখন তাদের বাড়িতে ঢুকি তারপর আমরা আর মানুষ থাকি না’- এই শিরোনামে সংস্থাটি ভুক্তভোগী ১৯ জন নারীর অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছিল ওই রিপোর্টে।
যদিও সৌদি সরকার অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালকে জানিয়েছে যে, বর্তমান বিধিবিধান অনুযায়ী গৃহকর্মীরা সুরক্ষিত এবং নির্যাতনের যেকোনো অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হয়।
এর আগে ১৯৯৮ সালে কুয়েতে এক নেপালি গৃহকর্মীর মৃত্যুর পর নেপাল সরকার সৌদি আরবসহ বেশ কয়েকটি দেশে নারী কর্মী পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছিল এবং ২০২২ সালে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করলেও কর্মী পাঠানোর বিষয়ে সমঝোতা হয়নি।
সম্পাদক : মাহমুদুল হাসান, বার্তা সম্পাদক: এ এইচ সুমন
oporadhkantho@gmail.com
Copyright © 2026 অপরাধ কণ্ঠ. All rights reserved.