অভিযোগে জড়িত ব্যক্তি এসআইকে পুরস্কৃত করলেন কক্সবাজারের পুলিশ সুপার


  প্রকাশিত হয়েছেঃ   ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩৮ এএম

কক্সবাজারে এক লাখ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট আত্মসাতের অভিযোগে অভিযুক্ত এসআই গোলাম কিবরিয়াকে নগদ অর্থ পুরস্কার দিয়ে বিতর্কের মুখে পড়েছেন জেলা পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান। বালুখালী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ কিবরিয়ার বিরুদ্ধে ইয়াবা গায়েবের অভিযোগ নিয়ে যখন ব্যাপক তোলপাড় চলছে, ঠিক সেই দিনই প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে উখিয়া থানায় গিয়ে এসপি নিজে ওই কর্মকর্তার হাতে পুরস্কার তুলে দেন। সরওয়ারের ভাষ্য অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিকে প্রথমে বালুখালী পুলিশ ফাঁড়িতে এবং পরে উখিয়া থানায় নেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, পুলিশ সুপার কার্যালয়ের ঠিক সামনেই মিলেছে ইয়াবার গুদাম। ঘটনার পর তারিন নামের এক নারীকে আটক করে পুলিশ এবং তাঁর ব্যাগ থেকে হত্যায় ব্যবহৃত ছুরি উদ্ধারের কথা জানায়। তবে খোরশেদের জানাজা চলাকালেই এক সংবাদ সম্মেলনে তারিনকে নির্দোষ ঘোষণা করেন পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমান।

রোববার বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইয়াবা আত্মসাতের অভিযোগটি প্রকাশিত হওয়ার পর পুলিশের ভূমিকা নিয়ে জনমনে ক্ষোভ দেখা দেয়। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী পুলিশের মাসিক সভায় ভালো কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পুরস্কার দেওয়া হয়, কিন্তু সেই নিয়ম ভেঙে অভিযোগ প্রকাশের দিনই সরাসরি থানায় গিয়ে এসআই কিবরিয়া এবং উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) পুরস্কার দেওয়ার ঘটনাটি রহস্য তৈরি করেছে।

ঘটনার সূত্রপাত ২২ অক্টোবর সকালে, যখন উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের থাইংখালী এলাকা থেকে ছৈয়দ বশর ওরফে সিসি বশরকে আটক করা হয়। অভিযোগকারী সরওয়ার সিকদারের ভাষ্যমতে, অভিযানে দেড় লাখ ইয়াবা উদ্ধার করা হলেও এসআই কিবরিয়া মাত্র ৫০ হাজার ইয়াবা জব্দের কথা নথিবদ্ধ করেন। সরওয়ারের দাবি, বাকি এক লাখ ইয়াবা এক কোটি ১০ লাখ টাকায় মাদক কারবারিদের কাছে বিক্রি করা হয়েছে।

মামলার এজাহারে উল্লিখিত সাক্ষী দেলোয়ার ও সাদ্দাম জানিয়েছেন, তারা অভিযানে মাদক উদ্ধারের বিষয়ে কিছুই জানেন না এবং সাক্ষী হিসেবে তাদের নাম ব্যবহারের বিষয়টি সম্পর্কেও তারা অবগত নন। স্থানীয়রা দাবি করছেন, সিসিটিভি ফুটেজ, জব্দ তালিকা ও মামলার নথিপত্র নিরপেক্ষভাবে যাচাই করলে উদ্ধারকৃত ইয়াবার প্রকৃত পরিমাণ বেরিয়ে আসবে। তবে অনেক ঘটনায় মামলা বা জিডি না হওয়ায় প্রকৃত চিত্র পরিসংখ্যানে উঠে আসছে না।

পুলিশের একটি সূত্রের দাবি, ২২ অক্টোবরের ওই অভিযানে ৫০ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের কারণেই কর্মকর্তাদের পুরস্কৃত করা হয়েছে। তবে একই অভিযানে এক লাখ ইয়াবা গায়েবের গুরুতর অভিযোগ থাকার পরও কেন তদন্তের আগে পুরস্কার দেওয়া হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খোদ পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, এমন পরিস্থিতি তাদের জন্য বিব্রতকর। এরপর বালুখালীর জোড়াব্রিজ এলাকায় ৫০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধারের বিষয়টি কাগজে-কলমে দেখানো হয়। তবে অভিযানের সময় সেখান থেকে দুই লাখ পিস ইয়াবা গায়েব হয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে, যা নিয়ে পুরো জেলায় তোলপাড় শুরু হয়। পুলিশের একাধিক সূত্রের দাবি, যোগদানের পর থেকে নানা অপকর্মে জড়িত ও বিতর্কিত কর্মকর্তাদের শাস্তির বদলে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে আসছেন এই পুলিশ সুপার। বিষয়টি পুলিশ সুপারকেও জানানো হয়েছিল, কিন্তু কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই পুলিশ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

এদিকে, এসপি সাজেদুর রহমানের মেয়াদের শুরু থেকেই কক্সবাজারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি এসপির কার্যালয়ের সামনের গুদাম থেকে তিন লাখ ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনায় তিনজনকে আটক করা হলেও, সেই অভিযানেও দুই লাখ ইয়াবা গয়াব হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত ইয়াবা পাচারকারীদের খুঁজে বের করতে পুলিশের আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ এম নজরুল ইসলাম বলেন, যোগদানের পর থেকে পুলিশের হেফাজত থেকে ইয়াবা গায়েব হওয়া যেন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি ১০১ জন পুলিশ সদস্যের গণবদলি কার্যকর করা হলেও, অভিজ্ঞ সদস্যদের সরিয়ে দেওয়ায় মাঠপর্যায়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পরিসংখ্যান বলছে, এ বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত কক্সবাজারে ৯৫টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এমনকি দিনদুপুরে ঈদগাঁও-ঈদগড় সড়কে গণডাকাতির ঘটনা ঘটেছে, যেখানে অন্তত অর্ধশত যানবাহনে লুটপাট চালানো হয়। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা হয়েছে দেড় শতাধিক।

এছাড়া ১২৭টি ধর্ষণ ও ২৯৭টি অপমৃত্যুসহ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে অপরাধ।

আদালত প্রাঙ্গণের নিরাপত্তা নিয়েও রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। গত বছরের ৩০ নভেম্বর বিচারককে পিস্তল দেখিয়ে ভয় দেখানোর ঘটনার পর চলতি বছরের ২৪ মে আদালত প্রাঙ্গণে প্রকাশ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এসব বিষয়ে পুলিশ সুপারের কাছে একাধিকবার নিরাপত্তার আবেদন করা হলেও কার্যকর সাড়া পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও পর্যটন এলাকাসহ জেলায় প্রতিদিন ১৫ থেকে ৩০টি চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে বলে জানা গেছে। ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর আদালত প্রাঙ্গণে এক যুবক পিস্তল দেখিয়ে একজন বিচারককে ভয় দেখান বলে জানিয়েছেন জেলা জজ পদমর্যাদার একজন বিচারক। এর মধ্যে গত ২৪ মে আদালত প্রাঙ্গণে প্রকাশ্যে গোলাগুলিতে দুজন গুলিবিদ্ধসহ কয়েকজন আহত হন।

চলতি বছরের ২৪ মার্চ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক খোরশেদ আলম নিহতের ঘটনায়ও পুলিশের তদন্ত নিয়ে অনাস্থা তৈরি হয়। পুলিশ সুপার প্রাথমিক তদন্তে অভিযুক্তকে নির্দোষ দাবি করলেও, পরে পরিবারের আবেদনে আদালত মামলাটি পিবিআইতে স্থানান্তর করেন। একইভাবে খুরুশকুলে মন্দিরের সেবায়ক হত্যার ঘটনা নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর সাংবাদিককে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এসপি ঘনিষ্ঠ এলআইসি সদস্য সোহেলের বিরুদ্ধে। গত ২২ এপ্রিল কক্সবাজার শহরতলির খুরুশকুলে মন্দিরের সেবায়েত নয়ন সাধুকে হত্যার পর তাঁর লাশ গাছে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।

ইয়াবা আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়ে জানতে এসপি এএনএম সাজেদুর রহমানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। তবে চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আবদুল কুদ্দুস জানিয়েছেন, অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে পুরস্কৃত করার বিষয়টি সম্পর্কে তিনি আগে অবগত ছিলেন না। স্থানীয়দের দাবি, ইয়াবা গায়েবের মতো গুরুতর অভিযোগের ঘটনাটি নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় এনে দোষীদের আইনের আওতায় আনা হোক।