নেতানিয়াহুকে হটাতে আরব জোটের সমর্থন নিয়ে নতুন সমীকরণ

ইসরাইলের সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে আরব দলগুলোর জোট নজিরবিহীন সাফল্য অর্জন করেছে।
নেসেটে রেকর্ড ১৯টি আসন পাওয়ার ফলে দেশটির রাজনীতিতে তারা এখন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।
জোটটির প্রভাবশালী নেতা ইউসেফ জাবারিন জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তার কট্টর ডানপন্থি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে বিরোধী ‘চেঞ্জ’ জোটের সঙ্গে সমন্বয় করতে তারা আগ্রহী। নতুন সরকার গঠন সহজ হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ‘চেঞ্জ’ জোটের দলগুলোকে প্রথমে প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য একজন প্রার্থী ঠিক করতে হবে। ডানপন্থী বিরোধী নেতা আভিগদর লিবারম্যান আরব দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতার বিষয়ে সবচেয়ে বেশি আপত্তি জানাচ্ছেন বলে জানা গেছে। নেতানিয়াহুকে সরিয়ে সংখ্যালঘু সরকার গঠন এবং সেটিকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে হলে ইসরায়েলি সমাজের দীর্ঘদিনের বৈষম্য দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে বলে মনে করেন জাবারিন।
তার মতে, ইসরাইলের রাজনৈতিক গতিপথ বদলে দেওয়ার জন্য এটি একটি ঐতিহাসিক সুযোগ।
নির্বাচনে আরব ইসরাইলিদের ভোটদানের হার এবার দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে প্রায় ৮০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
ইসরাইলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত নাগরিক, যাদের এই বিপুল অংশগ্রহণ নির্বাচনী ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলেছে।
যদিও অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গাজায় বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদের ভোট দেওয়ার সুযোগ ছিল না। জাবারিন বলেন, প্রায় ৮ লাখ ৪০ হাজার ফিলিস্তিনি-ইসরাইলি ভোটারের মূল লক্ষ্যই হলো বর্তমান সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানো।
নেতানিয়াহুর জোটের আসনসংখ্যা ৬৮ থেকে কমে ৫৩-তে নেমে এসেছে। অন্যদিকে অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন জিওনিস্ট দলগুলোর ‘চেঞ্জ’ জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। সরকার গঠন প্রক্রিয়া জটিল আকার ধারণ করায় আরবদের সমর্থন এখন নির্ণায়ক হয়ে উঠেছে। আরব দলগুলোর মধ্যে জয়েন্ট লিস্ট ১১টি এবং রক্ষণশীল ইসলামপন্থি দল রা’আম ৮টি আসন পেয়েছে। ১২০ আসনের ইসরাইলি পার্লামেন্ট নেসেটে নেতানিয়াহুর জোটের আসনসংখ্যা ৬৮ থেকে কমে ৫৩-তে দাঁড়িয়েছে। সব মিলিয়ে আরব দলগুলোর আসনসংখ্যা ১৯, যা দেশটির পার্লামেন্টে তাদের জন্য রেকর্ড। আইজেনকোট ও তার সহযোগীরা নেতানিয়াহুর সঙ্গে ঐক্য সরকার গঠন না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
জাবারিন জানান, আরব সম্প্রদায় গত চার বছরে কাঠামোগত বৈষম্য ও নিপীড়নের শিকার হয়েছে। ঘরবাড়ি ভাঙা, অপরাধ দমনকারী সংস্থার নিষ্ক্রিয়তা এবং পর্যাপ্ত বরাদ্দ না পাওয়ার মতো সমস্যার কারণে তারা বর্তমান সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ। তিনি অভিযোগ করেন যে, নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহু কোনো প্রমাণ ছাড়াই আরব দলগুলোর বিরুদ্ধে কাতারের অর্থ গ্রহণের যে অভিযোগ তুলেছিলেন, তা ছিল মূলত আরবদের রাজনৈতিক শক্তিকে হেয় করার হীন প্রচেষ্টা। বিশেষ করে জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির এবং অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচের মতো কট্টরপন্থি নেতাদের সরকারের বাইরে দেখতে চান তারা। আরব অধ্যুষিত এলাকায় বাড়িঘর ভাঙা, অপরাধী চক্রের তৎপরতা ঠেকাতে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা, পৌরসভা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ না দেওয়া এবং তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগের অভাব ছিল এ সময়ের বড় সমস্যা। তিনি আরো বলেন, আরবদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদ, শারীরিক হামলা এবং পুলিশের নিষ্ঠুর আচরণ পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে। পরবর্তী সরকার গঠনের দায়িত্ব কাকে দেওয়া হবে, সে বিষয়ে তাদের মতামত নেবেন তিনি। তবে নেতানিয়াহুর কট্টরপন্থী সরকারকে সরাতে নিজেদের রাজনৈতিক শক্তি কাজে লাগাতে চান তারা। ৫৪ বছর বয়সী জাবারিন পেশায় আইন বিষয়ে সাবেক অধ্যাপক। জয়েন্ট লিস্টের কর্মকর্তারা বলছেন, ফিলিস্তিনি দলগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্বের বিষয়টি লিবারম্যানের জন্য সত্যিই আপত্তিকর, নাকি তিনি গুরুত্বপূর্ণ কোনো মন্ত্রিত্ব পাওয়ার জন্য দর-কষাকষি করছেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। নেতানিয়াহু ক্ষমতার পালাবদল ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মিলে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারেন—এমন আশঙ্কাও রয়েছে জাবারিনের।
আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন সরকারে যোগ দেওয়ার বিষয়ে কিছু শর্ত রয়েছে, যার মধ্যে ইসরাইলকে ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিন্দার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত। জাবারিন স্পষ্ট করেছেন যে, জয়েন্ট লিস্ট সরাসরি সরকারে অংশ নেবে না। বরং সরকারে না থেকেও তারা পার্লামেন্টে কৌশলগত ভোটের মাধ্যমে বিরোধী জোটকে টিকিয়ে রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে।
উম্ম আল-ফাহম শহরে এক সাক্ষাৎকারে জাবারিন আরো বলেন, ফিলিস্তিনিদের ওপর দখলদারত্ব অব্যাহত থাকা অবস্থায় কোনো সরকারের অংশ হওয়া তাদের জন্য অসম্ভব। তবে নীতি পরিবর্তন এবং আরব সম্প্রদায়ের অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তারা বিরোধী জোটের সাথে কাজ করতে চান। নতুন সরকার গঠনে বিলম্ব হলেও নেসেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগ দেখছেন তিনি, কারণ নেতানিয়াহুবিরোধী শিবিরের হাতে এখন ৬৭ জন সদস্য রয়েছে। আশা করি, বিরোধী শিবিরে এমন অংশীদার পাওয়া যাবে, যারা এই পরিবর্তন বাস্তবায়নে এগিয়ে আসবে।’। আইজেনকোট যদি পরিবর্তনের কথা বলেন, তবে সেই পরিবর্তনের সুফল আরব সম্প্রদায়ের কাছেও পৌঁছাতে হবে।
তিনি মনে করেন, পার্লামেন্টের স্পিকার পরিবর্তন এবং আইন প্রণয়ন কমিটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হতে পারে প্রথম পদক্ষেপ। এছাড়া আগের সরকারের পাস করা বিতর্কিত আইনগুলো বাতিল করাকে নতুন পার্লামেন্টের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। জাবারিন আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ক্ষমতা ধরে রাখতে নেতানিয়াহু যুদ্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারেন। সব মিলিয়ে ইসরাইলের আগামী দিনগুলো দেশটির রাজনীতির জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পাশাপাশি আইন প্রণয়নের কর্মসূচি তদারকির দায়িত্বে থাকা কমিটির নিয়ন্ত্রণও বিরোধীরা নিতে পারে।