ইয়েমেনে নতুন সংঘাতে বাস্তুচ্যুত ২ লাখ ৯০ হাজার মানুষ


  প্রকাশিত হয়েছেঃ   ১ নভেম্বর ২০২৬, ৯:০৮ এএম

ইয়েমেনে গত আগস্ট মাসে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে অন্তত ২ লাখ ৯০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সংস্থা (ওসিএইচএ) জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাস্তুচ্যুতদের মধ্যে ৬ হাজার ১০০ জন অন্তঃসত্ত্বা নারী রয়েছেন, যাদের মধ্যে অন্তত ৬০০ জনের আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে সন্তান জন্ম দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই নাজুক জনগোষ্ঠীর সহায়তায় ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসা দল ও ধাত্রী পাঠানো হয়েছে।

ইয়েমেনের পশ্চিমা সমর্থিত সরকারের অনুগত বাহিনী এবং ইরান সমর্থিত হুথিদের মধ্যে তাইজ প্রদেশ ও উপকূলীয় অঞ্চলে লড়াই তীব্র হয়েছে। ওসিএইচএর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির ৬৫ হাজার শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীও বর্তমানে চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। খাদ্য, স্বাস্থ্যবিধি উপকরণ এবং জরুরি নগদ সহায়তার মাধ্যমে প্রায় ২ লাখ ৪৯ হাজার মানুষের কাছে ত্রাণ পৌঁছেছে, যা মোট বাস্তুচ্যুতদের প্রায় ৭৫ শতাংশ। এতে হাজারো মানুষের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। শুক্রবার প্রকাশিত ওসিএইচএর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়েমেনে থাকা ৬৫ হাজার শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীও দ্রুত অবনতিশীল পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন। একই সঙ্গে খাদ্য ও জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়ছে। একই দিন দেশটির দক্ষিণাঞ্চল লক্ষ্য করে ছোড়া একটি হুথি ক্ষেপণাস্ত্রও প্রতিহত করা হয়। জাতিসংঘ জানিয়েছে, গত আগস্ট থেকে ইয়েমেনে ২৭০ জন বেসামরিক মানুষের হতাহতের ঘটনা তারা নিশ্চিত করেছে। এই প্রাসাদই দেশটির অন্তর্বর্তী রাজধানীতে সরকারের কার্যক্রম পরিচালনার কেন্দ্র। এতে সরকার দক্ষিণাঞ্চলে সরে যেতে বাধ্য হয়।

সংঘাত শুধু ইয়েমেনের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা সৌদি আরবের ভূখণ্ডেও ছড়িয়ে পড়ছে। সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে সীমান্ত পেরিয়ে সৌদি আরবেও।

শনিবার সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট রিয়াদ অঞ্চলের আকাশে একটি ড্রোন ভূপাতিত করার কথা জানিয়েছে।

এর আগে মক্কা, মদিনা ও রিয়াদের কাছেও ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগ উঠেছে।

তবে হুথিদের মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি এই অভিযোগ অস্বীকার করে একে মিথ্যা বলে দাবি করেছেন। যদিও অতীতে সৌদি রাজধানী, বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনায় হামলার দায় স্বীকার করেছে হুথিরা। গত ১০ অক্টোবর রিয়াদের কিং খালিদ বিমানবন্দরে হামলায় ১৩ জন নিহত ও ৩০০ জনের বেশি আহত হন, যা বিগত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ছিল। জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করছে। ইসলামের দুই পবিত্র নগরী মক্কা ও মদিনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর অভিযোগ হুথিরা বারবার অস্বীকার করেছে। এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি ভূখণ্ডে এটিই সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা। চলতি মাসে শহরটির দক্ষিণে আল-তুরবাহসহ কয়েকটি এলাকা দখলে নেওয়ার পর হুথিরা তাইজকে আরো শক্তভাবে ঘিরে ফেলেছে।

এডেনের প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ মা’আশিক ও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে হুথিরা তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে বলে সরকারি বাহিনী জানিয়েছে। বিমানবন্দরটি মেরামতের পর পুনরায় চালুর ঠিক পরের দিনই এই হামলার ঘটনা ঘটে। ইয়েমেনের মন্ত্রিসভা এসব হামলাকে সরাসরি বেসামরিক স্বার্থে আঘাত এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান অকার্যকর করার ষড়যন্ত্র হিসেবে অভিহিত করেছে। এ ছাড়া এডেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে।

সরকারি বাহিনীর মুখপাত্র মেজর মাজেদ আবদুল্লাহ আল-নুজাইলি দাবি করেছেন, বিভিন্ন ফ্রন্টে তাদের অভিযানে হুথিদের প্রায় ৩৩৬ জন যোদ্ধা ও কমান্ডার নিহত হয়েছেন এবং ১১২টি যানবাহন ও ভারী সরঞ্জাম ধ্বংস হয়েছে। অন্যদিকে, ইয়েমেনের মানবাধিকার নেটওয়ার্কের তথ্যমতে, ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত তাইজ প্রদেশে ১৮৯ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। ভুক্তভোগীদের মধ্যে ৩৮ শিশু ও ২৭ জন নারী রয়েছেন। এই সময়ে ২৩টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং ৩০০টির বেশি অপহরণ ও গুমের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। তার ভাষ্য, তাইজ, মারিব, আল-জাওফ ও আল-বাইদাসহ বিভিন্ন ফ্রন্টে হুথিদের কমান্ড সেন্টার, সেনা সমাবেশ ও সরবরাহ রুট লক্ষ্য করে যুদ্ধবিমান, ড্রোন, কামান ও রকেট লঞ্চার ব্যবহার করা হয়েছে।

যুদ্ধের কারণে রাস্তাঘাট বন্ধ থাকায় প্রায় ২০ লাখ মানুষের কাছে খাদ্য, জ্বালানি, পানি ও জরুরি ওষুধ পৌঁছানো বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

তাইজ শহর ঘিরে হুথিদের সাম্প্রতিক তৎপরতা এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অস্থিরতায় মানবিক পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে।

২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে হুথিরা সানা দখল করার পর ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ শুরু হয় এবং ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট সামরিক হস্তক্ষেপ করলে যুদ্ধের মাত্রা আরও বৃদ্ধি পায়।

জি-২০ সম্মেলনের ফাঁকে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে ইয়েমেন পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে যৌথভাবে এসব হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। শনিবার জর্জিয়ার আটলান্টায় জি-২০ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে যোগ দেন সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ।