বুড়িচংয়ে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতার নিহতের ৪ বছরেও হয়নি বিচার

কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার মোকাম ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি জাকির হোসেনের মৃত্যুর চার বছর পেরিয়ে গেছে। ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর ভোরে নিজ বাড়ির পাশ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই দীর্ঘ সময়েও নিহতের পরিবার কোনো মামলা দায়ের করতে পারেনি। পরিবারটির অভিযোগ, পুলিশ ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নির্যাতনে জাকির হোসেনের মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে তার স্ত্রী ও সন্তানরা চরম আতঙ্ক ও মানবেতর জীবনযাপন করছেন। গত ১৫ সেপ্টেম্বর জাকির হোসেনের বাড়িতে গিয়ে কথা হয় প্রতিবেশী শাকিব হোসেনের সঙ্গে। এই ভয়ে আমি তখন মামলা করতে পারিনি। পরিবার কেন এখনো মামলা করতে পারছে না, সে বিষয়ে জাকিরের স্ত্রীই ভালো বলতে পারবে।
ঘটনার সময় বুড়িচং থানার ওসি ছিলেন আবুল হাসনাত খন্দকার। তৎকালীন পুলিশ সুপার আব্দুল মান্নান ও ওসি আবুল হাসনাত খন্দকার দাবি করেছিলেন, পুলিশ জাকিরকে না পেয়েই চলে এসেছিল এবং হত্যার অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ অসত্য। তবে পরিবারের দাবি, তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কামরান হোসেন, ওসি আবুল হাসনাত, ফাঁড়ি ইনচার্জ জাবেদ এবং এসআই রাজীবের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানেই এই ঘটনা ঘটে। এতে স্থানীয় নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা সহযোগিতা করেছিল।
সে সময় দেবপুর ফাঁড়ির ইনচার্জ জাবেদ উল ইসলাম অভিযানের সত্যতা স্বীকার করলেও জাকিরকে পাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছিলেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, জাকিরের শরীরে হাতকড়ার দাগ, অণ্ডকোষে আঘাতসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে নির্যাতনের স্পষ্ট চিহ্ন ছিল। প্রতিবেশী শাকিব হোসেন জানান, ঘটনার দিন ভোরে মুসল্লিরা মসজিদে যাওয়ার পথে জাকিরকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখেন। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। যে স্থানটিতে জাকির হোসেনের মরদেহ ফেলে রাখা হয়েছিল, তা দেখিয়ে শাকিব বলেন, ওই দিন ভোরে মিজান কাকা নামাজের জন্য মসজিদে যাওয়ার সময় দেখেন জাকির মাটিতে পড়ে আছেন। আমরা সবাই মিলে তাকে ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক জানান তিনি বেঁচে নেই। কিন্তু যেদিন তাকে মেরে ফেলে রেখে যায়, সেদিন আমরা কোনো শব্দ শুনতে পাইনি।
প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রতিবেশীদের আতঙ্ক যেন কাটছেই না। ঘটনার সময় জাকিরের বাড়ির পাশের ঘরের মালিক মাজেদা খাতুন জানান, পুলিশের ভয়ে জাকির প্রায়ই লুকিয়ে থাকতেন। সেদিনের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা মনে করে এখনো আতঙ্কিত হন স্থানীয়রা। জাকিরের শাশুড়ি আনোয়ারা বেগম অভিযোগ করেন, মামলা করলে বিপদের আশঙ্কায় তার মেয়ে ও নাতিরা কোনো আইনি পদক্ষেপ নিতে সাহস পাচ্ছে না। এখন মামলা করলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আমার মেয়ে ও নাতিদের মেরে ফেলবে।
স্ত্রী আকলিমা আক্তার পলি জানান, স্বামী হারানোর পর থেকে ভাঙা টিনের ঘরে এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে অত্যন্ত কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন তিনি। তার ভাষ্য, মামলার কথা ভাবলেই রাজনৈতিক রোষানলে পড়ার ভয়ে আঁতকে ওঠেন। তিনি আক্ষেপ করে জানান, দলের বিপদের দিনে বিএনপি নেতাদের পক্ষ থেকে তেমন কোনো সহযোগিতা বা নিয়মিত খোঁজখবর পাননি তারা।
স্থানীয় বিএনপি নেতা ও মোকাম ইউনিয়ন সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম জানান, জাকিরের জানাজায় তিনি বক্তব্য দিয়েছিলেন। এর দুই দিনের মাথায় তাকেও গ্রেপ্তার করা হয়। তবে পরিবারের মামলা না করার বিষয়ে তিনি জাকিরের স্ত্রীর ওপর দায়ভার ছেড়ে দিয়েছেন। শুধু গত দুই ঈদে বিএনপির নেতারা খোঁজ নিয়েছিলেন, এরপর আর কেউ খোঁজ রাখেননি।
বর্তমান পরিস্থিতির বিষয়ে বুড়িচং থানার ওসি লুৎফুর রহমান জানান, ঘটনাটি বেশ পুরনো। এখন পর্যন্ত থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। ভুক্তভোগী পরিবার অভিযোগ দিলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেছেন।