ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে বাংলাদেশের অসহায় আত্মসমর্পণ, ঝুঁকিতে সিরিজ

অস্ট্রেলিয়াকে তাদের মাটিতে হারিয়ে যে আত্মবিশ্বাস অর্জন করেছিল বাংলাদেশ, ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম টেস্টে তা যেন ধূলিসাৎ হয়ে গেল। সেই দলই এবার নিজেদের মাঠে মুখ থুবড়ে পড়ল। ঘরের মাঠে এমন আত্মসমর্পণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি নিছক পরাজয় নয়, ক্রিকেটীয় অধঃপতন। পরিস্থিতি নয়, প্রশ্ন উঠছে খেলোয়াড়দের মানসিকতা নিয়ে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ খেলেছে আত্মঘাতী ক্রিকেট। সময়ের অভাব ছিল না, ছিল ক্রিকেট সেন্সের অভাব। বাকিদের ব্যাটিং ছিল একেবারেই হতাশাজনক। দিনের প্রথম ওভারেই বিদায় নিলেন জাকের আলি। দলের বিপদের দিনে দায়িত্ব নেওয়ার বদলে আত্মসমর্পণ। ক্যারিয়ারের প্রথম ফিফটিতে তার লড়াইয়ে অন্তত সম্মান বেঁচেছে। সামনের সারির ব্যাটাররা অবশ্য সেই দায়িত্ব নেননি। তাওহীদ হৃদয়ের ব্যাটিং দেখে বিস্মিত হতে হয়।
টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নামলেও প্রথম টেস্টেই করুণ পরিণতি বরণ করতে হলো স্বাগতিকদের। আট উইকেটের বড় ব্যবধানে হারার পর এখন সিরিজ হারের প্রবল শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই পরাজয় কেবল একটি ম্যাচ হার নয়, বরং বাংলাদেশ ক্রিকেটের সামগ্রিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।
ম্যাচের প্রতিটি বিভাগেই চরম বিশৃঙ্খলা দেখা গেছে। প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ ২৭২ রান সংগ্রহ করলেও দ্বিতীয় ইনিংসে তা ১৪২ রানে থেমে যায়। অথচ প্রথম ইনিংসে ২৭ রানের লিড পাওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু ব্যাটারদের দায়িত্বহীনতা আর উইকেটে টিকে থাকার অনীহা দলকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়। নাঈম হাসানের ক্যারিয়ারসেরা ফিফটি ছাড়া আর কেউই বড় ধরনের লড়াই করতে পারেননি। উত্তরটা লুকিয়ে আছে প্রতিটি বিভাগে। কিন্তু ম্যাচ শেষ হতে চতুর্থ দিনও লাগেনি। সাদমানের সেঞ্চুরি ছাড়া এই ইনিংসে উল্লেখযোগ্য কিছুই নেই। ২৭ রানের লিড পেয়েও রক্ষা পায়নি বাংলাদেশ। ছয় উইকেটে ৭৯ রান নিয়ে শুরু চতুর্থ দিন।
ব্যাটারদের মধ্যে তাওহীদ হৃদয় ও মেহেদী মিরাজের মতো অভিজ্ঞ খেলোয়াড়রাও অতি-আক্রমণাত্মক মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। ছক্কা মারার নেশায় উইকেট বিলিয়ে দেওয়া বা স্পিনের বিপক্ষে ভুল টেকনিক বেছে নেওয়াটা ছিল আত্মঘাতী। প্রতিপক্ষ ওয়েস্ট ইন্ডিজের ওয়ারিক্যান ও রস্টন চেইসের মতো স্পিনাররা বাংলাদেশের ব্যাটারদের ব্যর্থতাকে কাজে লাগিয়ে অনায়াসেই উইকেট তুলে নিয়েছেন। ওয়ারিক্যান পুরো ম্যাচে ৯টি উইকেট শিকার করেছেন। দুই ইনিংসেই ছক্কা মারতে গিয়ে উইকেট দিয়েছেন।
ফিল্ডিংয়ে বাংলাদেশ ছিল হাস্যকর। ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংসে ফিল্ডাররা ছয়টি সহজ সুযোগ হাতছাড়া করেছেন, যা টেস্ট ক্রিকেটের মতো পর্যায়ে অকল্পনীয়। নাজমুল হোসেন শান্ত স্লিপে এবং ইবাদত হোসেন লং অফে সহজ ক্যাচ মিস করেছেন। ক্যাচ ফেলার ফলে ব্র্যান্ডন কিংয়ের মতো ব্যাটাররা বারবার জীবন পেয়েছেন, যা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের হারের পথ প্রশস্ত করেছে। ব্যাটিংয়ে দায়িত্বহীনতা, ফিল্ডিংয়ে হাস্যকর ভুল, বোলিংয়ে পরিকল্পনাহীনতা। বৃষ্টি আর আলোকস্বল্পতায় বারবার খেলা বন্ধ হয়েছে। বরং দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটাররা আত্মসমর্পণের প্রতিযোগিতায় নামলেন। ওয়ারিক্যানকে চার মেরে পরের বলেই স্লিপে ক্যাচ।
মিরপুরের স্পিনবান্ধব উইকেটে বাংলাদেশের স্পিনাররা যেখানে খাবি খেয়েছেন, সেখানে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ১৭০ রানের লক্ষ্য তাড়ায় মাত্র ৩৫.১ ওভারে জয় তুলে নিয়েছে। মিরাজ, তাইজুল ও নাঈম ১২৯ রান দিয়েও কোনো উইকেট পাননি। এটি প্রমাণ করে যে নিজের মাঠেও বাংলাদেশ বোলিংয়ে কোনো প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হয়েছে।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্র্যান্ডন কিং অপরাজিত ৮১ এবং হজ ৩১ রানে অপরাজিত থেকে দলের জয় নিশ্চিত করেন। শরিফুল ও হাসান মাহমুদ কিছুক্ষণের জন্য লড়াই করলেও তা ম্যাচ বাঁচানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না। ক্যাম্পবেল ৪৯ রানে আউট হওয়ার পর দুই উইকেটে ১২০ রান সংগ্রহ করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচ হাতের মুঠোয় নিয়ে নেয়। জবাবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ থেমেছে ২৪৫ রানে।
আগামী বৃহস্পতিবার সিলেটে দ্বিতীয় টেস্ট শুরু হবে। এই সিরিজ বাঁচানোই এখন বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। টিম ম্যানেজমেন্টকে খেলোয়াড়দের মানসিকতায় পরিবর্তন আনা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। কারণ পরাজয়ের ধারা অব্যাহত থাকলে ২-০ ব্যবধানে সিরিজ হারানোর লজ্জা বরণ করতে হবে স্বাগতিকদের।