যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন আজ, ভাগ্যপরীক্ষায় ট্রাম্প ও তার নীতি


  প্রকাশিত হয়েছেঃ   ৩ নভেম্বর ২০২৬, ৯:৩১ এএম

যুক্তরাষ্ট্রে আজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে মধ্যবর্তী নির্বাচন। ভোটাররা এই নির্বাচনে কংগ্রেসের দুই কক্ষের শত শত প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন। এবারের ভোটের ফলাফলকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলের ওপর একটি গণভোট হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে থাকবে, তার ওপরই নির্ভর করছে ট্রাম্প তার মেয়াদের বাকি দুই বছর কতটা ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন। এই নির্বাচনের প্রভাব ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পর্যন্ত গড়াতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। একই সঙ্গে ২০২৮ সালের নির্বাচনে কোন ইস্যু ও প্রার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেন, সে বিষয়েও ইঙ্গিত পাওয়া যাবে। তবে এবারের নির্বাচনে তাকেই কেন্দ্র করে প্রচারের বড় অংশ আবর্তিত হচ্ছে। যে দলই জয়ী হোক, মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল ভোটারদের মনোভাব সম্পর্কে আগাম ধারণা দেবে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের চার বছর মেয়াদি শাসনের মাঝামাঝি সময়ে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কংগ্রেসের দুটি কক্ষ হলো প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট। এবারের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সবকটিতেই ভোট হচ্ছে। অন্যদিকে সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ৩৬টিতে নতুন গভর্নর নির্বাচন করবেন ভোটাররা।

বর্তমানে রিপাবলিকান পার্টি—যা গ্র্যান্ড ওল্ড পার্টি (জিওপি) নামেও পরিচিত—প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট উভয় কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রেখেছে। তবে এই ব্যবধান অত্যন্ত সামান্য। স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী, ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল সাধারণত মধ্যবর্তী নির্বাচনে আসন হারায়, যার ফলে ডেমোক্র্যাটদের সামনে কংগ্রেসে নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে থাকে, তার ওপরই নির্ভর করবে কেন্দ্রীয় আইন প্রণয়নের ক্ষমতা। কংগ্রেসে পাস হওয়া কেন্দ্রীয় আইন যুক্তরাষ্ট্রের কোটি কোটি মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে। বাকি আসনগুলোর বেশির ভাগই রিপাবলিকান অথবা ডেমোক্র্যাটদের শক্ত ঘাঁটিতে।

প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার জন্য ডেমোক্র্যাটদের বর্তমান অবস্থানের চেয়ে নিট তিনটি আসন বেশি প্রয়োজন। যদিও প্রতিনিধি পরিষদের সবকটি আসনে নির্বাচন হচ্ছে, কিন্তু বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে মাত্র ৪০টি আসনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পূর্বাভাস পাওয়া গেছে। এই অল্প কয়েকটি আসনের ফলাফলই শেষ পর্যন্ত কক্ষটির নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ করতে পারে। এর মধ্যে প্রায় ১২টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে।

সিনেটের হিসাব কিছুটা ভিন্ন। ১০০ সদস্যের এই কক্ষে এবার ৩৫টি আসনে ভোট হচ্ছে। বর্তমানে সিনেটে রিপাবলিকানদের দখলে ৫৩টি আসন, আর ডেমোক্র্যাট ও স্বতন্ত্র সদস্যদের মোট আসন ৪৭টি। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য ডেমোক্র্যাটদের চারটি আসন বাড়িয়ে ৫১টিতে পৌঁছাতে হবে। অন্যদিকে রিপাবলিকানরা তিনটি আসন হারালেও তাদের হাতেই নিয়ন্ত্রণ থেকে যাবে। কারণ, ভোটের অচলাবস্থা তৈরি হলে ভাইস প্রেসিডেন্ট, অর্থাৎ বর্তমানে রিপাবলিকান জেডি ভ্যান্স, নির্ণায়ক ভোট দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিতে ডেমোক্র্যাটদের চারটি আসন বাড়িয়ে ৫১-তে পৌঁছাতে হবে। কারণ, সিনেটে দুই দলের আসন সমান ৫০-৫০ হলে ভোটের অচলাবস্থা নিরসনে ভোট দিতে পারেন ভাইস প্রেসিডেন্ট।

নির্বাচনি পূর্বাভাস অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পুনর্দখল করার সম্ভাবনা দেখছে। এটি ঘটলে ট্রাম্পের রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। এছাড়া ডেমোক্র্যাটরা প্রশাসনের ওপর নজরদারি বাড়িয়ে তদন্ত, সমন জারি ও কংগ্রেসের শুনানির হার বাড়িয়ে দিতে পারেন। এমনকি পরিস্থিতি জটিল হলে ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পকে অভিশংসনের উদ্যোগও নিতে পারেন।

নির্বাচনের নিয়মনীতি ও পরিবেশ নিয়েও এবার বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ১০টি অঙ্গরাজ্যে নির্বাচনি এলাকার মানচিত্র নতুন করে নির্ধারণ বা ‘রিডিস্ট্রিক্টিং’ করা হয়েছে। কুক পলিটিক্যাল রিপোর্টের তথ্যমতে, এই পুনর্নির্ধারণের ফলে রিপাবলিকানরা নিট পাঁচটি অতিরিক্ত আসনের সুবিধা পেয়েছেন। পাশাপাশি ভোটারদের যোগ্যতা ও ডাকযোগে ব্যালট পাঠানোর প্রক্রিয়া নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের কিছু রায় ভোটাধিকার আইনকে দুর্বল করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচনি প্রচারে হস্তক্ষেপের হুমকি ও দলীয় কোন্দল নিয়ে ইতোমধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। সাধারণত প্রতি ১০ বছর পর নির্বাচনি এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হয়। জাতিগত বৈষম্য থেকে ভোটারদের সুরক্ষা দিতে ঐতিহাসিকভাবে এ আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল।

ব্যালটে নাম না থাকলেও এবারের নির্বাচনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি রিপাবলিকানদের জন্য নিজেকে প্রধান নির্বাচনি সম্পদ হিসেবে তুলে ধরছেন। যদিও জনমত জরিপে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা নিয়ে মিশ্র তথ্য রয়েছে, তবুও তিনি মনে করেন তার ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও মাগা সমর্থকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ দলের পরাজয় এড়াতে সাহায্য করবে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে ‘ট্রাম্প-এ-পালুজা’ সম্মেলনের মাধ্যমে তিনি দলের প্রচারণার মূল কেন্দ্রে চলে আসেন। এর মাধ্যমে ঐতিহাসিকভাবে কম ভোটার উপস্থিতির এই নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব।

ডেমোক্র্যাটদের কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতেও রয়েছে ট্রাম্প ও তার বিভিন্ন নীতি। তারা এই নির্বাচনকে ট্রাম্পের ক্ষমতার লাগাম টেনে ধরার একটি সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছেন। অন্যদিকে ট্রাম্প নিজের পছন্দের প্রার্থীদের প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়ে কংগ্রেসের অনেক আসনে প্রভাব বিস্তার করছেন।

২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রস্তুতিতে এই মধ্যবর্তী নির্বাচনের গুরুত্ব অপরিসীম।

যদি ডেমোক্র্যাটরা বড় জয় পায়, তবে দলটি নতুন গতি পাবে এবং নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পারবে।

বিপরীতে, রিপাবলিকানরা যদি নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সক্ষম হয়, তবে ট্রাম্পের প্রশাসন কর্মসূচি বাস্তবায়নে আরও শক্তিশালী অবস্থানে থাকবে। এছাড়া গভর্নর পদের ফলাফলও দুই দলের সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের জন্য জাতীয় পরিচিতি বৃদ্ধির সুযোগ হিসেবে কাজ করবে, যা পরবর্তী নির্বাচনের ইস্যু নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ ছাড়া গভর্নর নির্বাচনের ফলও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে।