সৌদি সীমান্তে হুথিদের একের পর এক নতুন স্থল অভিযান


  প্রকাশিত হয়েছেঃ   ৩ নভেম্বর ২০২৬, ৯:৩১ পিএম

ইয়েমেনের গণ্ডি পেরিয়ে সৌদি আরবের দক্ষিণ সীমান্তে নিজেদের সংঘাতের পরিধি বাড়িয়েছে হুথি বিদ্রোহীরা। সাম্প্রতিক কয়েক মাস ধরে সৌদি সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বিভিন্ন চৌকিতে একের পর এক স্থল অভিযান চালিয়েছে সংগঠনটি। পশ্চিমা ও আরব বিশ্বের দুজন কর্মকর্তার বরাতে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই। সে সময় ইয়েমেনের এই সশস্ত্র গোষ্ঠী বিভিন্ন স্থানে স্থল অভিযানও চালিয়েছিল।

প্রতিবেদন অনুসারে, সৌদি আরবের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পাহাড়ি ও দুর্গম সীমান্ত এলাকায় হুথিরা ছোট পরিসরে এসব সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে। গত অক্টোবরের শেষ দিকেও এমন একটি অভিযানের ঘটনা ঘটেছে, যা আধুনিক নজরদারি সরঞ্জামের মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এক পশ্চিমা কর্মকর্তা। ওই কর্মকর্তার দাবি, এই অভিযানের সময় সৌদি সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ব্যবহৃত কিছু হালকা আগ্নেয়াস্ত্রও হুথিরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। সৌদি ভূখণ্ড নিয়ে হুতিদের পুরোনো দাবি।

যদিও সরকারিভাবে এসব অভিযানের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসেনি, তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইয়েমেনে যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর সৌদি ভূখণ্ডে এটিই হুথিদের প্রথম সরাসরি স্থল অনুপ্রবেশের ঘটনা। ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তির আগে সীমান্তবর্তী বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি ও শহরে হুথিদের নিয়মিত অনুপ্রবেশের চেষ্টা চলত, যেখানে তারা প্রায়ই স্থল অভিযান পরিচালনা করত।

ইয়েমেনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও বাশা রিপোর্ট রিস্ক অ্যাডভাইজরির প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আল-বাশা নিয়মিত সৌদি সীমান্তের নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। তিনি জানান, হুথিরা ধীরে ধীরে তাদের হামলার তীব্রতা ও পরিধি বৃদ্ধি করছে। আল-বাশার বর্ণনা অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে দূরপাল্লার ড্রোন ও স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে শুরু হলেও, পরবর্তী সময়ে ছোট কোয়াডকপ্টার ড্রোন ও স্নাইপার বাহিনীর মাধ্যমে তারা নতুন কৌশলে হামলা চালাচ্ছে।

রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের সহযোগী ফেলো আল-বাশা মনে করেন, স্থলপথে বড় ধরনের হামলার পুনরাবৃত্তি কেবল সময়ের ব্যাপার। অতীতে ইয়েমেন যুদ্ধের শুরুর দিকে হুতিযোদ্ধারা যেভাবে আকস্মিক হামলার পর অস্ত্র দখল ও সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস করে দ্রুত পিছু হটত, বর্তমানের প্রাথমিক অভিযানগুলো অনেকটা সেই কৌশলেরই প্রতিফলন।

সীমান্তে হুথিদের এই নতুন তৎপরতা সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মিসর, পাকিস্তান ও তুরস্কের মতো মিত্রদেশগুলোর সামরিক সহায়তা সৌদি আরবের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তুরস্ক ও পাকিস্তান দেশটিতে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও সামরিক সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা নিশ্চিত করেছে। গত সপ্তাহে মিসরের পার্লামেন্টও সৌদি আরবে প্রতিরক্ষামূলক বাহিনী পাঠানোর অনুমোদন দিয়েছে। এছাড়া সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানি জানিয়েছেন, দামেস্কও এ ধরনের চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে। এক পশ্চিমা কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, সৌদি সমর্থিত বাহিনীকে সহায়তার জন্য সিরিয়ার কয়েকজন ড্রোন বিশেষজ্ঞ ইতিমধ্যে ইয়েমেনে পৌঁছেছেন।

সীমান্তে অস্থিরতার পাশাপাশি ইয়েমেনের অভ্যন্তরেও হুথিরা তাদের সামরিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছে। সৌদি সমর্থিত সরকারি বাহিনী বর্তমানে হুথিদের মোকাবিলা করতে হিমশিম খাচ্ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথিরা ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের প্রশাসনিক কেন্দ্র এডেন বন্দরের ৫০ মাইলের মধ্যে চলে এসেছে এবং কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ শহর তাইজকে চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছে। ইয়েমেনের ভেতরেও অগ্রসর হচ্ছে হুথিরা।

উল্লেখ্য, অতীতেও সৌদি আরবের বেসামরিক অবকাঠামো, বিমানবন্দর ও জ্বালানি স্থাপনা লক্ষ্য করে শত শত বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে হুথিরা। এসব হামলায় অন্তত ২৪ জন নিহত হয়েছেন। নিরাপত্তা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতির কারণে রিয়াদকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ সম্মেলনও বাতিল করতে হয়েছিল। সৌদি সীমান্তের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেশটির প্রত্যন্ত দক্ষিণাঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে আবারো সামনে নিয়ে এসেছে।

সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলীয় এলাকা নিয়ে হুথিদের দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক দাবি রয়েছে। ১৯৩৪ সালের তায়েফ চুক্তির মাধ্যমে সৌদি আরবের কাছে হস্তান্তরিত হওয়া আসির, জাজান ও নাজরান প্রদেশ নিয়ে ইয়েমেনের পক্ষ থেকে সবসময়ই একটি বিরোধপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখা হয়েছে। হুথি আন্দোলনের উৎপত্তিস্থল হলো ইয়েমেনের সাদা প্রদেশের পার্বত্য এলাকা, যার নামকরণ করা হয়েছে প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন বদরুদ্দিন আল-হুতির নামানুসারে। জায়েদি শিয়া মতাদর্শ অনুসারী এই সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্ব নিজেদের হাশেমি বংশোদ্ভূত দাবি করে এবং মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বংশের সাথে সম্পর্কের দাবি তুলে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে চায়। ইয়েমেনের রাজধানী সানা থেকে পরিচালিত হুতি প্রশাসন মূলত দেশটির অভ্যন্তরেই সামরিক কার্যক্রম চালালেও সৌদি আরবের কয়েকটি ভূখণ্ড নিয়ে তাদের ঐতিহাসিক দাবি রয়েছে।