চট্টগ্রাম মহানগর আদালতে ৬৬ হাজার মামলার জট: বিচারক মাত্র ৮ জন

চট্টগ্রাম মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারাধীন মামলার পাহাড়সম স্তূপ তৈরি হয়েছে। বর্তমানে এই আদালতে মামলার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৬ হাজার ৪১৮টি। অথচ এই বিশাল পরিমাণ বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন মাত্র আটজন বিচারক। দীর্ঘদিন ধরে আদালতের সংখ্যা অপরিবর্তিত থাকায় বিচারিক প্রক্রিয়ায় ভয়াবহ জট সৃষ্টি হয়েছে। মহানগরীর ১৬টি থানার বিপরীতে আদালতের এই স্বল্পতা বিচারপ্রার্থীদের জন্য চরম দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চট্টগ্রাম মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৬ হাজার ৪১৮।
আদালত সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিচারকদের ওপর অস্বাভাবিক কাজের চাপ তৈরি হয়েছে। পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় শুনানি ও আদেশসহ দৈনন্দিন বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনায় আদালত কার্যত হিমশিম খাচ্ছে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৭ সালের তুলনায় বর্তমানে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা তিনগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ সেই অনুপাতে বিচারিক অবকাঠামো বা আদালতের সংখ্যা বাড়ানোর কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বর্তমানে প্রতিটি মহানগর ম্যাজিস্ট্রেটের ওপর গড়ে ৮ হাজার ৩০০টির বেশি মামলার ভার রয়েছে, যা বিচারিক গতিকে মন্থর করে তুলছে। এ পরিস্থিতিতে বিচারিক কার্যক্রমের গতি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। তবে এখনো অবকাঠামো নির্মাণের কাজ চলছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল ৫৯ হাজার ৯৪৯টি, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৬৬ হাজার ২৪৯টিতে। চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত এই সংখ্যা ৬৬ হাজার ৪১৮টিতে ঠেকেছে। প্রতি কর্মদিবসে গড়ে দুই শতাধিক নতুন মামলা যুক্ত হচ্ছে, যা বিচারকদের কাজের পরিধিকে প্রতিনিয়ত বিস্তৃত করছে। যদিও ২০২৫ সালে ৩৯ হাজার ৮১৫টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে, তবুও মামলার ক্রমবর্ধমান চাপের বিপরীতে এই সংখ্যা যথেষ্ট নয়। চলতি বছরের জুলাইয়ে ৭ হাজার ৮৬০টি, আগস্টে ১৪ হাজার ২০৬টি এবং সেপ্টেম্বরে ১৩ হাজার ৪৮৯টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। ফলে ক্রমবর্ধমান মামলার চাপ সামলাতে বিদ্যমান আদালতগুলোকে প্রতিনিয়ত বেগ পেতে হচ্ছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী, ১৯৭৯ সালে একজন চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ও তিনজন ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। অপরাধের ধরন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে ১৯৯২ সালে ম্যাজিস্ট্রেটের সংখ্যা পাঁচজনে উন্নীত করা হয়। এরপর ২০০০ সালে অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিমের পদ সৃষ্টি এবং ২০০৮ সালে আদালতের সংখ্যা বাড়িয়ে আটটিতে উন্নীত করা হয়। কিন্তু এরপর দীর্ঘ ১৮ বছরে মহানগরীর জনপরিসর ও মামলার সংখ্যা বহুগুণ বাড়লেও নতুন কোনো আদালত গঠন করা হয়নি। তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সালে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ১৫ হাজার ১০৬টিতে পৌঁছালে ২০০৮ সালে সর্বশেষ চট্টগ্রাম মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সংখ্যা বাড়িয়ে আটটি করা হয়। ১৯৯২ সালে চট্টগ্রাম মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল ৮,৫৬৭।
দীর্ঘদিন ধরে এই সংকট সমাধানে প্রশাসনিক উদ্যোগের অভাব স্পষ্ট। আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মতে, ২০১৩ সাল থেকে দফায় দফায় জনপ্রশাসন ও আইন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিলেও কোনো সুফল মেলেনি। সর্বশেষ এ বছরের জানুয়ারিতে তিনটি নতুন চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ও ২০টি মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রতিষ্ঠার আবেদন করা হয়েছে, যা এখনও প্রক্রিয়াধীন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মফিজুল হক ভূঁইয়া জানিয়েছেন, সরকার বিচারক বাড়ানোর বিষয়ে ইতিবাচক। তবে অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে দেরি হচ্ছে। তিনি বলেন, বিচারক ও জনবল নিয়োগের পাশাপাশি নতুন আদালত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অবকাঠামো সম্প্রসারণ এখন সময়ের দাবি।
তাত্ক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি আরও চরম পর্যায়ে পৌঁছানোর আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। সীমিত সংখ্যক বিচারক ও দীর্ঘস্থায়ী বিচারিক জট নিরসনে এখন দ্রুত নতুন আদালত প্রতিষ্ঠা ও নিয়োগ প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করা ছাড়া বিকল্প নেই।