অরুণাচল সীমান্তে ভারত-চীন সেনা মুখোমুখি, তথ্য দিলেন আইটিবিপি প্রধান

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য অরুণাচল প্রদেশে ভারত-চীন সীমান্তে উভয় দেশের সেনাবাহিনী নতুন করে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে। হিমালয় সংলগ্ন সীমান্ত পাহারার দায়িত্বে থাকা ভারতের আধা-সামরিক বাহিনী ইন্দো-তিব্বত বর্ডার পুলিশ বা আইটিবিপির প্রধান শত্রুজিৎ কাপুর সম্প্রতি এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। ২০২০ সালে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় ঘটা প্রাণঘাতী সংঘাতের পর সীমান্তে এই অস্থিতিশীলতা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কঠোর জাতীয় নিরাপত্তা ভাবমূর্তিকে আবারও তীব্র বিতর্কের মুখে ফেলেছে। গত মাসে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ভারত সফর এবং মোদির সঙ্গে বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ইঙ্গিত মিলেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধও বেইজিং ও নয়াদিল্লিকে সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী করেছে।
অরুণাচল সীমান্ত ও চীনের অনুপ্রবেশের অভিযোগ
অরুণাচল প্রদেশের সীমান্তবর্তী প্রত্যন্ত আপার সুবানসিরি এলাকায় চীনা সেনারা অনুপ্রবেশ করেছে এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর নিয়মিত টহলে বাধা দিয়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অরুণাচলের কংগ্রেস নেতা বসিরাম সিরাম দাবি করেছেন, চীনা সামরিক বাহিনী ভারতের ভূখণ্ডের প্রায় ৫০ কিলোমিটার ভেতরে ঢুকে পড়েছে। তিনি পরিস্থিতি বর্ণনা করে বলেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়ের চূড়ায় চীনা সেনারা অবস্থান নিয়েছে এবং ভারতীয় সেনারা নিচে অবস্থান করছেন। তবে এসব দাবির ব্যাপারে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার স্পষ্ট করে কিছু জানায়নি।
সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আইটিবিপির অবস্থান
আইটিবিপি প্রধান শত্রুজিৎ কাপুর উল্লেখ করেছেন, চীন তাদের সীমান্তবর্তী অংশে সামরিক সক্ষমতা ও পরিকাঠামো বহুগুণ বাড়িয়ে নিয়েছে। এর ফলে ঐতিহ্যবাহী উপায়ে সরাসরি সংঘাতের মাধ্যমে তাদের মোকাবিলা করা কঠিন হতে পারে। লাদাখ ও অরুণাচলের এই পরিস্থিতি সামাল দিতে আইটিবিপির সদস্যদের বিশেষ কৌশলগত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
ঐতিহাসিক ম্যাকমোহন লাইন ও সীমানা বিরোধ
ভারত ও চীনের সীমান্ত বিরোধের শেকড় বহু পুরনো। ১৯১৪ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারত ও তিব্বতের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘সিমলা কনভেনশন’ অনুযায়ী নির্ধারিত ম্যাকমোহন লাইনকে ভারত তাদের বৈধ সীমান্ত বলে মনে করে। তবে ১৯৪৯ সালে কমিউনিস্ট শাসনে আসা চীন এই চুক্তিকে স্বীকৃতি দেয় না। বেইজিংয়ের দাবি, এককভাবে তিব্বতের এই চুক্তি করার বৈধ কোনো ক্ষমতা ছিল না। ফলে তারা পুরো অরুণাচল প্রদেশকে ‘দক্ষিণ তিব্বত’ বা ‘জাংনান’ বলে দাবি করে আসছে। এর বাইরে আকসাই চীন অঞ্চলটিও বেইজিংয়ের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যা কাশ্মীরের সীমানা বিরোধের অন্তর্ভুক্ত। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে ভারত ম্যাকমোহন লাইনকেই চীনের সঙ্গে তাদের সীমান্ত হিসেবে গণ্য করে আসছে। কিন্তু ১৯৪৯ সালে কমিউনিস্ট শাসনের অধীনে আসা চীন এই সীমানাকে স্বীকার করে না। এছাড়া, চীন আকসাই চীন অঞ্চলটিও নিয়ন্ত্রণ করে, যা কাশ্মীর বিরোধের অংশ-পুরো অঞ্চলটির ওপর ভারত ও পাকিস্তান উভয়ই নিজেদের দাবি জানিয়ে আসছে। ১৯৯৩ সালে দুই দেশ প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা এলএসি বরাবর শান্তি বজায় রাখার চুক্তি করলেও সীমান্তের সুনির্দিষ্ট অবস্থান নিয়ে মতপার্থক্য দূর হয়নি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা ও সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান
ভারতের পররাষ্ট্র मंत्रालয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, চীনা সেনারা প্রতিষ্ঠিত টহল ব্যবস্থা থেকে সরে গিয়ে অন্য পথে হাঁটলে সীমান্তে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়।
এর আগে ২০২০ সালে গালওয়ান সংঘর্ষে ভারতের ২০ জন এবং চীনের চারজন সেনা নিহত হন। ২০২০ সালের জুনে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় দুই দেশের সেনাদের সংঘর্ষে অন্তত ২০ ভারতীয় সেনা নিহত হন।
তখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চীনা বাহিনীর অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের কথা জানালেও, দুদিন পর প্রধানমন্ত্রী মোদি প্রকাশ্যে দাবি করেন ভারতের ভূখণ্ডে কেউ প্রবেশ করেনি। সরকারের সেই অসংসংলগ্ন বক্তব্যের স্পষ্ট উত্তর মেলেনি। দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বি আর দীপক বলেন, নতুন অনুপ্রবেশের তথ্য মোদি সরকারের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে বড় প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং সীমান্ত সমাধান পরিস্থিতি
সীমান্ত সমস্যা সমাধানে কূটনৈতিক ও সামরিক পর্যায়ে নিয়মিত আলোচনা চলছে। গত ৬ আগস্ট সীমান্তবিষয়ক পরামর্শ ও সমন্বয় ব্যবস্থার (ডব্লিউএমসিসি) ৩৬তম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এবং সেপ্টেম্বরে অরুণাচলে প্রথমবার কমান্ডার পর্যায়ের আলোচনা হয়। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক প্রবীণ ডনথি মনে করেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বলা হলেও চীনা সেনারা কৌশলগত চাপ সৃষ্টি করতেই সীমানায় এমন অস্থিতিশীল অবস্থা তৈরি করছে।
- অরুণাচল প্রদেশের আপার সুবানসিরিতে চীনা সেনাদের অনুপ্রবেশের অভিযোগ।
- কংগ্রেস নেতা বসিরাম সিরামের দাবি, ভারতীয় ভূখণ্ডের ৫০ কিমি ভেতরে অবস্থান নিয়েছে চীন।
- সীমান্তে টহল ব্যাহত হওয়ার তথ্য স্বীকার আইটিবিপি প্রধান শত্রুজিৎ কাপুরের।
- দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পরও কমেনি সীমান্ত উত্তেজনা, মোদি সরকারের নিরাপত্তা নীতি চ্যালেঞ্জের মুখে।