রমজানে তেলের দাম ১৫ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব ব্যবসায়ীদের


  প্রকাশিত হয়েছেঃ   ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ৬:৩৮ পিএম

পবিত্র রমজান উপলক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ পরিস্থিতি ও বাজারমূল্য পর্যালোচনার লক্ষ্যে গত সোমবার ২৬ অক্টোবর বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সভাপতিত্বে একটি জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধির দোহাই দিয়ে ভোজ্যতেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। তবে মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে এই প্রস্তাবের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি। এ অবস্থায় বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে ব্যবসায়ীদের সময়মতো প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির আহ্বান জানিয়েছে সরকার।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের পহেলা জুলাই থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, মসুর ডাল ও খেজুরের আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এদিকে বৈঠকের আলোচনা সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সচিব মো. নুরুল ইসলাম মোল্লা কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

এর মধ্যে মোট ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে ৮ লাখ ২৩ হাজার টন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ লাখ ১৮ হাজার টন বেশি। এ সময়ে মোট ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে ৮ লাখ ২৩ হাজার টন, যা গত বছরের একই সময়ের ৭ লাখ ৫ হাজার টনের তুলনায় ১ লাখ ১৮ হাজার টন বেশি। অর্থাৎ আমদানি বেড়েছে ৭০ হাজার টন।

এছাড়া ভোজ্যতেল আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে ৮ লাখ ৫ হাজার টনের, যা আগের বছরের চেয়ে ১ লাখ ৩১ হাজার টন বেশি। এ সময়ে ছোলা আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার টনের। মসুর ডাল আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার টনের।

চিনি আমদানির ক্ষেত্রে দেখা গেছে, এ সময়ে ৬ লাখ ৮৭ হাজার টন চিনি আমদানি করা হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ১ লাখ ৫৩ হাজার টন বেশি। ইফতারের অন্যতম প্রধান উপাদান ছোলার আমদানিতেও বড় উল্লম্ফন দেখা গেছে; গত বছরের ১২ হাজার টনের বিপরীতে এবার আমদানি হয়েছে ৮২ হাজার টন। মসুর ডাল আমদানির পরিমাণ ১ লাখ ২২ হাজার টনে দাঁড়িয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ৬৪ হাজার টন বেশি। এছাড়া খেজুর আমদানি ১১ হাজার টনে উন্নীত হয়েছে, যা গত বছর ছিল মাত্র ৪ হাজার টন।

বৈঠকে আমদানিকারকরা খেজুর আমদানিতে বর্তমানে বিদ্যমান প্রায় ৫৫ শতাংশ শুল্ক ও কর হার কমানোর দাবি জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্যমতে, উচ্চ শুল্কায়নমূল্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় খেজুরের আমদানি খরচ অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। ব্যবসায়ীদের মতে, বিকল্প পথে পণ্য আনতে হওয়ায় সাপ্লাই চেইন জটিল হয়ে পড়েছে এবং ঋণপত্র খুলতে জটিলতা অব্যাহত থাকলে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে খেজুর আমদানিতে শুল্ক ছাড় চেয়েছেন আমদানিকারকেরা। পাশাপাশি ফল আমদানিতে আরও নমনীয় করব্যবস্থা চালুর দাবি জানান তারা। আমদানিকারকদের যুক্তি, উচ্চ শুল্কের কারণে ফলের দাম সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির খেজুরের মান ও জাতের পার্থক্য বিবেচনায় নিয়ে শুল্ক কাঠামো যৌক্তিক করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেছেন। মিসর, সৌদি আরব, ইরাক ও আলজেরিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানিকৃত খেজুরের ক্ষেত্রে অভিন্ন শুল্কায়নমূল্য নির্ধারণ না করে প্রকৃত মানের ভিত্তিতে তা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন আমদানিকারকরা। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শুল্ক ছাড়ের বিষয়টি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাথে আলোচনা করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমদানি শুল্ক নির্ধারণের দায়িত্ব এনবিআরের হলেও এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন বলে বৈঠকে আলোচনা হয়। তিনি বলেন, এ জন্য আগাম প্রস্তুতির অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে।

বৈঠকে বড় ব্যবসায়ীদের আধিপত্যের ফলে ছোট ডাল মিলগুলোর সংকটের বিষয়টিও সামনে এসেছে। তবে ছোট ডাল মিলগুলোর ব্যবসা পরিচালনায় নানা সমস্যার কথাও বৈঠকে উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ ডাল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজী নেসার উদ্দিন জানান, ডালের চাহিদার ৮০ শতাংশ এবং ছোলার সম্পূর্ণ চাহিদা আমদানিনির্ভর হওয়ায় বড় কোম্পানিগুলোর দাপটে ছোট মিলগুলো এখন টিকে থাকার লড়াই করছে। সাধারণত এর বার্ষিক চাহিদার একটি বড় অংশ রমজানেই ভোগ করা হয়। ইফতারে পেঁয়াজু, বেগুনি ও ডালের বড়া এবং সেহরিতে ডাল খাওয়ার প্রচলন থাকায় মসুর ডালের চাহিদা বাড়ে।

এছাড়া সভায় চিনি ও ফল আমদানির শুল্ক পর্যালোচনার মাধ্যমে দাম সহনীয় রাখার বিষয়ে আলোচনা করা হয়। বর্তমান নীতিমালা অনুযায়ী, ছোলা ও মসুর ডাল আমদানিতে কোনো শুল্ক নেই।

পোল্ট্রি খাতের প্রতিনিধিরা সভায় জানিয়েছেন, ডিম ও মুরগির উৎপাদন পরিস্থিতি বর্তমানে সন্তোষজনক। খামার পর্যায়ে ডিমের দাম প্রতি পিস ১০ টাকার নিচে নেমে এসেছে। রোগবালাইয়ের প্রকোপ না থাকায় সরবরাহে ঘাটতির কোনো আশঙ্কা নেই। তবে রমজানে সকালের নাশতার ধরণ পরিবর্তনের ফলে ডিমের চাহিদা কিছুটা কমতে পারে বলে তারা ধারণা করছেন। এছাড়া সরকারের বিশেষ অনুমতি ছাড়া ডিম ও মাংস আমদানি সম্ভব নয় বলেও জানানো হয়েছে। তবে ঈদের পর মুরগির চাহিদা বাড়তে পারে, যার প্রভাব বাজারদরে পড়তে পারে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, রমজান মাসে সাধারণ সময়ের তুলনায় ভোজ্যতেল, চিনি, ডাল, ছোলা, খেজুর ও মুরগির চাহিদা দ্বিগুণ হয়ে যায়। বিশেষ করে চিনির চাহিদা ওই এক মাসে প্রায় ৩ লাখ টনে পৌঁছায়। সরকার রমজানে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ব্যবসায়ীদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে এবং যেকোনো সমস্যা সমাধানে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। কর্মকর্তারা জানান, এ-সংক্রান্ত অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। তিনি বলেন, কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। ভাজাপোড়া ও ইফতারের বিভিন্ন পদ তৈরিতে সয়াবিন ও পাম তেলের চাহিদাও স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেড়ে যায়।