পিএইচপি প্রোগ্রামিং ত্রুটিতে বিশ্বজুড়ে স্থবির সরকারি-বেসরকারি অনলাইন সেবা

প্রোগ্রামিং ভাষা ‘পিএইচপি’-তে গুরুতর একটি নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্তের জেরে বিশ্বজুড়ে সরকারি ও বেসরকারি খাতের অসংখ্য ওয়েবসাইট এবং অনলাইন সেবা বিঘ্নিত হয়েছে। বুধবার ও বৃহস্পতিবার চলা এই সংকটের কারণে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সরকারি ওয়েবসাইট, জার্মানির বিভিন্ন হাসপাতাল এবং ফ্রান্সের কর বিভাগসহ একাধিক দেশের গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়। সম্ভাব্য সাইবার আক্রমণ মোকাবিলায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে অনেক প্রতিষ্ঠান নিজ থেকেই তাদের সেবা স্থগিত করে দ্রুত নিরাপত্তা হালনাগাদ (প্যাচ) সম্পন্ন করে। পিএইচপি ফাউন্ডেশন দ্রুত ত্রুটি সংশোধনের প্যাচ প্রকাশ করায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এক দিনের কম সময়ের মধ্যেই সেবাগুলো স্বাভাবিক ছন্দে ফেরে। কিন্তু বুধবার ও বৃহস্পতিবার সেগুলোর বিঘ্নে দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। ওয়ার্ডপ্রেস ও ড্রুপালের মতো জনপ্রিয় সেবা তৈরিতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
নিরাপত্তা গবেষকদের মতে, এই ত্রুটি কাজে লাগিয়ে হ্যাকাররা সার্ভারের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া, গোপন তথ্য চুরি করা বা ওয়েবসাইটের কনটেন্ট পরিবর্তনের মতো সাইবার অপরাধ করতে পারত। আধুনিক ইন্টারনেটের একটি বড় অংশ, বিশেষ করে প্রায় ৭০ শতাংশ ওয়েবসাইট ও ওয়ার্ডপ্রেসের মতো প্ল্যাটফর্ম পিএইচপি ব্যবহার করে। এ কারণেই ত্রুটিটি প্রকাশ্যে আসার পর ক্লাউডফ্লেয়ারের মতো নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ৪৫ মিনিটে এটি কাজে লাগানোর চেষ্টা ১০ হাজার বার এবং দুই ঘণ্টার মধ্যে তা কয়েক লক্ষে পৌঁছায়। পরবর্তীতে এই চেষ্টা কয়েক মিলিয়নের সংখ্যা ছাড়িয়ে যায় বলে জানান ক্লাউডফ্লেয়ারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ম্যাথিউ প্রিন্স। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পিএইচপির ব্যবহার কমতে থাকলেও বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ ওয়েবসাইট ও ওয়েব অ্যাপ্লিকেশনে ভাষাটি ব্যবহৃত হয়। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত এই প্রোগ্রামিং ভাষাটি সহজ ও বিনা মূল্যে পাওয়া যায় বলে এখনো ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাঁর মতে, এআই নিয়ে নানা উদ্বেগ থাকলেও এ ঘটনায় প্রযুক্তিটি নিরাপত্তার দুর্বলতা শনাক্ত করতে সহায়তা করেছে।
ডিজিটাল প্রযুক্তিতে অত্যন্ত উন্নত দেশ ফিনল্যান্ডেও এই ত্রুটির বড় প্রভাব দেখা গেছে। দেশটির সরকারি অনেক সেবা বন্ধ থাকায় নাগরিকদের দৈনন্দিন কাজ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। হেলসিঙ্কির সফটওয়্যার ডেভেলপার ও নগর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কালে পুসা জানিয়েছেন, বর্জ্য অপসারণের মতো সাধারণ কাজ করতে গিয়েও তাকে সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে, যা নাগরিক জীবনে ডিজিটাল সেবার অপরিহার্যতা প্রমাণ করে। জার্মানির বিভিন্ন শহরসহ হ্যানোভার মেডিকেল স্কুলের ওয়েবসাইটও এই তালিকায় ছিল, তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে তাদের সিস্টেম হ্যাক হয়নি। তবে এই ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, ইন্টারনেটনির্ভর জীবনে একটি সফটওয়্যারের নিরাপত্তা ত্রুটিও কতটা ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। পুরোনো একটি সোফা সরিয়ে নিতে স্থানীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের কাছে আবেদন করতে চেয়েছিলেন পুসা।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ওয়েবসাইট বন্ধ রাখার পরামর্শ দেন। তিনি নিজেও জানান যে, নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তার সরকারি ওয়েবসাইটের প্রবেশাধিকার বন্ধ রাখা হয়েছিল। এছাড়া যুক্তরাজ্যের সরকারি ৩২টি অনলাইন সেবা এবং নেদারল্যান্ডসের ডিজিটাল পরিচয়পত্র ও অপরাধবিষয়ক পোর্টালগুলোও একই কারণে বন্ধ রাখা হয়। ফ্রান্সে কর সংক্রান্ত ওয়েবসাইটের কিছু সেবা বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত সচল করা সম্ভব হয়নি।
নিউইয়র্কভিত্তিক সফটওয়্যার নির্মাতা শেথ কফম্যানের মতে, পিএইচপি সহজলভ্য হওয়ায় প্রচুর সার্ভারে এর ব্যবহার রয়েছে, যা ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।
কেনিয়ার প্রযুক্তি উদ্যোক্তা অ্যান্থনি ওয়াম্বুয়া দ্রুত হালনাগাদ করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে সরকারি স্তরে ধীরগতির প্রতিক্রিয়ার সমালোচনা করেছেন।
অন্যদিকে, ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য এই বিঘ্ন ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
যুক্তরাজ্যের যোগাযোগসেবা প্রদানকারী অ্যালিস্টার গ্লিভস জানান, অনেক ছোট ব্যবসার ওয়েবসাইট সাত ঘণ্টা পর্যন্ত বন্ধ ছিল, এমনকি তৃতীয় পক্ষের পেমেন্ট গেটওয়ে বন্ধ থাকায় ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখেও পড়েছেন অনেকে। তবে এই ঘটনার একটি ইতিবাচক দিক হলো, এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে এই বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি আগেভাগেই শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।