নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে লন্ডনে মার্কিন দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভের পরিকল্পনা

যুক্তরাজ্যে প্যালেস্টাইন অ্যাকশন নামক সংগঠনকে সরকারিভাবে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে লন্ডনে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের সামনে বিশাল বিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন চার শতাধিক মানুষ। আগামী ৩১ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় এই কর্মসূচির মধ্য দিয়ে তারা সরকারের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নিজেদের অবস্থান জানান দিতে চান। একই দিনে স্কটল্যান্ডের এডিনবরায় অবস্থিত মার্কিন কনস্যুলেটের সামনেও অনুরূপ কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যে প্যালেস্টাইন অ্যাকশন গোষ্ঠীকে নিষিদ্ধ করার সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে লন্ডনে মার্কিন দূতাবাসের সামনে জড়ো হওয়ার পরিকল্পনা করেছেন ৪০০ জনের বেশি মানুষ। নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার আগে ট্রাম্পের ছেলে এরিক ট্রাম্প স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার জন সুইনির সঙ্গেও বৈঠক করেন। আন্দোলনকারীদের দাবি, প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে নিষিদ্ধ করার ফলে আইরিশ ঔপন্যাসিক স্যালি রুনির বইয়ের যুক্তরাজ্যে বিক্রিও কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
বিক্ষোভের আয়োজক সংগঠন ‘ডিফেন্ড আওয়ার জুরিস’ জানিয়েছে, সরকারের এই কঠোর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এটিই তাদের চূড়ান্ত গণপ্রতিবাদ। বিক্ষোভকারীদের হাতে প্ল্যাকার্ড থাকবে, যাতে লেখা হবে, ‘আমি গণহত্যার বিরোধিতা করি, আমি প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে সমর্থন করি।’
২০২৫ সালের জুলাই মাসে যুক্তরাজ্য সরকার প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করে নিষিদ্ধ করে। সেই থেকে এখন পর্যন্ত সংগঠনটিকে সমর্থন জানানোর দায়ে তিন হাজার ৮৫০ জনেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে দাবি করেছে ডিফেন্ড আওয়ার জুরিস। এরপর থেকে প্রকাশ্যে গোষ্ঠীটিকে সমর্থন জানানোর অভিযোগে ৩ হাজার ৮৫০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ডিফেন্ড আওয়ার জুরিস। বারবার গ্রেপ্তার হচ্ছেন বিক্ষোভকারীরা।
ঘটনার প্রেক্ষাপট অত্যন্ত জটিল। গত জুনে যুক্তরাজ্যের আপিল আদালত সরকারের পক্ষে রায় প্রদান করে হাই কোর্টের আগের একটি রায় বাতিল করেছিলেন, যেখানে এই নিষেধাজ্ঞাকে বেআইনি বলা হয়েছিল। এখন আগামী ৪ ও ৫ নভেম্বর এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই আপিলটি করেছেন সংগঠনটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা হুদা আম্মোরি। ওয়েস্টমিনস্টার ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বাইরে গোষ্ঠীটির আগের এক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া তেরেসার সঙ্গে কথা বলেছিল আলজাজিরা।
আন্দোলনকারীদের মতে, এই নিষেধাজ্ঞা জারির পেছনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপ রয়েছে।
তারা মনে করছেন, স্কটল্যান্ডে ট্রাম্পের মালিকানাধীন টার্নবেরি গলফ মাঠে প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের কর্মীদের রং ছিটানোর ঘটনার পরই সংগঠনটির ওপর এই খড়গ নেমে আসে।
ট্রাম্প নিজে এই ঘটনাকে ‘সন্ত্রাসবাদ’ বলে অভিহিত করেছিলেন এবং ব্রিটিশ সরকারের পদক্ষেপের প্রশংসা করেছিলেন। স্টারমার স্কটল্যান্ডের পুলিশ কর্তৃপক্ষের কাছে গ্রেপ্তারের বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য চেয়েছিলেন এবং ট্রাম্পকে পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেছিলেন। ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ওই কর্মকাণ্ডকে ‘সন্ত্রাসবাদ’ বলে অভিহিত করেন।
আইনি নথিপত্র থেকে জানা যায়, ২০২৫ সালের মার্চ মাসে এই ইস্যুতে কিয়ার স্টারমার ও ট্রাম্পের মধ্যে দুই দফা ফোনালাপ হয়েছিল।
এদিকে, সম্প্রতি একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তি ও তারকা, যাদের মধ্যে রয়েছেন পল মেসকাল, জেসি বাকলি, সুসান সারান্ডন এবং গ্যারি লিনেকার, এক যৌথ চিঠির মাধ্যমে এই কঠোর আইন প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। নিউ স্টেটসম্যান সাময়িকীতে প্রকাশিত সেই চিঠিতে বর্তমান সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। সাম্প্রতিক কর্মসূচিতে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন সংগীতশিল্পী দল ম্যাসিভ অ্যাটাকের রব ডেল নাজা, ৯৪ বছর বয়সি মানবাধিকার আইনজীবী মার্গারেট ওয়েন, সাবেক সরকারি উপদেষ্টা জোনাথন পোরিট এবং রেভারেন্ড সু পারফিট।
লেবার পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতা ও সাবেক ছায়া অ্যাটর্নি জেনারেল শামি চাকরাবর্তীও এই নিষেধাজ্ঞার কড়া সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্ত সন্ত্রাসবিরোধী আইনকে হাস্যকর করে তুলছে। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এখন যেকোনো বিষয়ে কথা বলার সময় সাবধান থাকতে হয়, নতুবা তাকেও গ্রেপ্তার করা হতে পারে। নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ করতে গিয়ে তাকে একাধিকবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আলজাজিরাকে তেরেসা বলেন, ‘গাজার জন্য এভাবে প্রতিবাদ করতে পারা সম্মানের বিষয়।’।
অন্যদিকে, ব্রিটিশ সরকার দাবি করছে, প্রতিরক্ষা স্থাপনায় অনধিকার প্রবেশ এবং সম্পদের ক্ষতির মতো কর্মকাণ্ডই এই নিষেধাজ্ঞার মূল ভিত্তি। তবে সংগঠনটির মুখপাত্রের মতে, তাদের আন্দোলন শান্তিপূর্ণ এবং সুপ্রিম কোর্টের শুনানির আগে এই গণপ্রতিবাদ ও গ্রেপ্তার হওয়ার ঝুঁকি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মৌলিক অধিকারগুলোকে জনসমক্ষে তুলে ধরবে। তার মতো আরো অনেকেই গ্রেপ্তার হয়েছেন।
সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে যখন ওয়াশিংটনও প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর ফলে আর্থিক বিধিনিষেধের কবলে পড়ে সুপ্রিম কোর্টের লড়াইয়ের জন্য তহবিল সংগ্রহ করতে হিমশিম খাচ্ছে সংগঠনটি। ৩১ অক্টোবর একই দিনে গ্লাসগোর হাইকোর্টে টার্নবেরি কাণ্ডে জড়িত সাতজনের বিচারের শুনানিও অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যেখানে সরকারি কৌঁসুলিরা তাদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে সাজা দেওয়ার জন্য আবেদন করছেন। সমালোচকরা একে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থা হিসেবেই দেখছেন। হ্যালোইন উপলক্ষে ৩১ অক্টোবরের এই বিক্ষোভের তিন দিন আগে গ্লাসগোর হাইকোর্টে টার্নবেরির ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচারসংক্রান্ত শুনানি হওয়ার কথা। তথ্য অধিকার আইনে প্রকাশিত নথিতে দেখা যায়, ওই বৈঠকে টার্নবেরির প্রতিবাদের বিষয়টি আলোচনায় এসেছিল। সমালোচকেরা এই পদক্ষেপকে ‘সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ’ বলে মন্তব্য করেছেন।