পিরোজপুরে সাঈদীর মামলার বাদীকে পুলিশ প্রহরায় দাফন

পিরোজপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে করা মামলার বাদী মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফন সম্পন্ন হয়েছে কড়া পুলিশি পাহারায়। শনিবার দিবাগত রাত ১টার দিকে প্রশাসনের সহযোগিতায় এই দাফন প্রক্রিয়া শেষ হয়। এর আগে, তাঁকে গার্ড অব অনার প্রদান ও দাফনকে কেন্দ্র করে এলাকায় দিনভর ব্যাপক উত্তেজনা বিরাজ করে। এর আগে শনিবার তাঁকে গার্ড অব অনার দিতে ও দাফনে বাধা দেন জামায়াতের নেতা-কর্মীরা। শনিবার দুপুরে গার্ড অব অনার দেওয়ার কথা থাকলেও জামায়াতের বাধায় ওই সময় তা দেওয়া সম্ভব হয়নি।
মানিক পশারীর পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, তিনি শনিবার সকাল ১০টার দিকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় তাঁর মেয়ের জামাইয়ের বাড়িতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর থেকে তিনি পলাতক ছিলেন এবং গত দুই মাস ধরে অসুস্থতায় ভুগছিলেন। তাঁর মরদেহ পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে আনা হলে স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের বাধার মুখে পড়ে। বিক্ষোভকারীরা দাবি করেন, মানিক পশারী একজন ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’, তাই তাঁকে গার্ড অব অনার দেওয়া যাবে না। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ জনতা তাঁর জন্য খনন করা কবরটি মাটি ভরাট করে নষ্ট করে দেয়। মানিক পশারীর পরিবার জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিনি পলাতক ছিলেন। তিনি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মেয়ের জামাইয়ের কাছে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
পরিস্থিতি প্রতিকূল হওয়ায় পরে পুলিশ কড়া প্রহরায় মরদেহ পিরোজপুর পুলিশ লাইনে নিয়ে যায়। সেখানে পাঁচ ঘণ্টা পর গোপনে তাঁকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। এ সময় পুলিশ লাইনের চারপাশে বিপুল সংখ্যক জামায়াত নেতাকর্মী অবস্থান নেন। দাফন সম্পন্ন হলেও নিজ এলাকায় তাঁর কোনো জানাজা অনুষ্ঠিত হয়নি। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইফতেখারুল ইসলাম শামীম জানান, পুলিশি প্রহরায় ও তাঁর উপস্থিতিতে রাতেই দাফন কাজ শেষ করা হয়েছে।
এদিকে, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে ও বর্তমান সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদী অভিযোগ করেছেন যে, মানিক পশারী মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে তাঁর বাবার বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। তিনি দাবি করেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানিক পশারী নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে তিনি মুক্তিযুদ্ধ করেননি। মাসুদ সাঈদীর ভাষ্যমতে, তৎকালীন জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতির প্রত্যক্ষ মদতে ও ডিউ লেটার ব্যবহার করে তাঁকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত করা হয়। তবে সরকারি তালিকায় নাম থাকায় সরকার তাঁকে গার্ড অব অনার প্রদান করেছে, এতে তাঁর আপত্তি নেই বলে জানান তিনি।
মানিক পশারীর পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, সকালের দিকে মরদেহ নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে যাওয়ার পর তাঁদের বিকেল ৫টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। অ্যাম্বুলেন্সে যথাযথ সংরক্ষণ ব্যবস্থা ছাড়াই দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার পর পুলিশ লাইনে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেওয়া হয়। শনিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে পাড়েরহাট বন্দরে নাসিম সাঈদীর নেতৃত্বে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়।
স্থানীয় জামায়াত নেতারা জানান, পিরোজপুরের মাটিতে কোনোভাবেই এমন বিতর্কিত ব্যক্তির দাফন হতে দেওয়া হবে না। একই সুরে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম বাতেন ও মির্জা জহুরুল হক দাবি করেন, আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে মামলা করার পর তাঁকে কৌশলে মুক্তিযোদ্ধা বানানো হয়েছে। দিনভর এসব ঘটনার সাক্ষী ছিল পুরো পিরোজপুর এলাকা, যেখানে কবর খুঁড়তে স্থানীয়রা অস্বীকৃতি জানালে শেষ পর্যন্ত তাঁর বোন ও দুই মেয়ে কবর খনন করেন।