সাত দশকেও কাটেনি পাবনা মানসিক হাসপাতালের সংকট


  প্রকাশিত হয়েছেঃ   ১ নভেম্বর ২০২৬, ৩:৪১ পিএম

১৯৫৭ সালে পাবনার হেমায়েতপুরে দেশের প্রথম ও একমাত্র বিশেষায়িত মানসিক হাসপাতাল হিসেবে যাত্রা শুরু করে পাবনা মানসিক হাসপাতাল। কিন্তু দীর্ঘ সাত দশকের পথচলায় প্রতিষ্ঠানটি উন্নয়নের ছোঁয়া থেকে বঞ্চিত রয়ে গেছে। আজও হাসপাতালটিতে তীব্র অবকাঠামোগত সংকট, প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, ওষুধ ও আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাব প্রকট। ৫০০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রশাসনিক ও জনবল কাঠামো এখনো ২৫০ শয্যার পুরোনো নিয়মে পরিচালিত হচ্ছে, যা চিকিৎসা সেবায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, কাগজ-কলমে হাসপাতালটি ৫০০ শয্যার হলেও প্রশাসনিক ও জনবল কাঠামো এখনো আড়াই দশক আগের ২৫০ শয্যার ভিত্তিতেই পরিচালিত হচ্ছে। ঢাকার ২০০ শয্যার জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে ৫০ জন চিকিৎসক থাকলেও পাবনায় ৫০০ রোগীর বিপরীতে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ মাত্র ৩১টি, যার ৯টি শূন্য। প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সময় পরও হাসপাতালটির অবকাঠামো ও জনবল সংকট কাটেনি। বিশেষ করে নারীদের ‘কনভার্সন ডিজঅর্ডার’ বা হিস্টোরিয়ার লক্ষণকে গুরুত্ব না দিয়ে বিকল্প চিকিৎসা করানো হয়। আবার অনেকেই মানসিক সমস্যার জন্য মনোরোগ বিশেষজ্ঞের বদলে নিউরোলজিস্ট বা মেডিসিন বিশেষজ্ঞের কাছে যান, যা চিকিৎসা প্রক্রিয়াকে আরো জটিল করে তোলে। পরিবারের এমন আচরণ অত্যন্ত অমানবিক এবং সমাজ এখনো মানসিক রোগকে স্বাভাবিক অসুস্থতা হিসেবে গ্রহণ করতে পারেনি।

হাসপাতালের মোট ৩১টি চিকিৎসকের পদের মধ্যে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ২২ জন। প্রথম শ্রেণির সাতটি পদের মধ্যে চারটি, দ্বিতীয় শ্রেণির সাতটি এবং তৃতীয় শ্রেণির ২৩টি পদ খালি। চতুর্থ শ্রেণির ১৭০টি পদের মধ্যে ১১০টি পদই শূন্য পড়ে আছে। এছাড়া ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের তিনটি পদের কোনোটিতেই জনবল নেই। ইইজি ও ইলেকট্রোকনভালসিভ থেরাপির মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতির অধিকাংশ দীর্ঘদিন ধরে অকেজো অবস্থায় পড়ে থাকায় রোগীদের বাইরে গিয়ে পরীক্ষা করাতে হয়। ফলে পরীক্ষা করাতে শহরের বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে হয় রোগীদের।

বর্তমানে হাসপাতালটিতে ১৯টি ওয়ার্ডে ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সি রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, যার মধ্যে পাঁচটি নারী ও ১৪টি পুরুষ ওয়ার্ড। ভর্তির প্রক্রিয়ায় এনআইডি, জন্মসনদ এবং ১৫ টাকা ফি লাগে, আর পেয়িং বেডের জন্য মাসিক ৯,৭৫০ টাকা জমা দিতে হয়। রোগীদের খাবারের জন্য দৈনিক মাথাপিছু ১৭৫ টাকা বরাদ্দ থাকলেও ভ্যাট-ট্যাক্স কাটার পর তা থেকে পুষ্টি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। আগে এখানে কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও বর্তমানে তা পুরোপুরি বন্ধ। এখন বিনোদনের জন্য রোগীদের কোনো সুযোগ নেই, কেবল নার্স রুমের দূরের টেলিভিশন দেখার মতো পরিস্থিতি বিদ্যমান। হাসপাতালকর্মীদের ভাষ্য, রোগীদের চার বেলার খাবারের জন্য সরকারিভাবে বরাদ্দ মাত্র ১৭৫ টাকা। এর মধ্য থেকে ১৮ শতাংশ ভ্যাট-ট্যাক্স কেটে নেওয়া হয়। একসময় এই হাসপাতালে রোগীদের চিকিৎসার অংশ হিসেবে তাঁতশিল্প, বেতের কাজ, কাঠের কাজ ও দর্জির কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। প্রশিক্ষণ ভবনগুলোয় থাকছেন নিরাপত্তায় নিয়োজিত আনসার বাহিনীর সদস্যরা। বিনোদন বলতে নার্সদের রুমের দেয়ালে থাকা দূরবর্তী টেলিভিশনের দিকে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে থাকা।

হাসপাতালের অমানবিক পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে কিছু তথাকথিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর। তারা নিরাপত্তারক্ষীদের ম্যানেজ করে ভেতরে ঢুকে রোগীদের বিভিন্ন লোভ দেখিয়ে উসকানিমূলক ভিডিও ধারণ করছে, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় রোগী ও তাদের পরিবার হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সামিনা আক্তার জানান, সামাজিক সচেতনতার অভাব এবং কবিরাজ বা ঝাড়ফুঁকের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা অনেক ক্ষেত্রে রোগীদের চিকিৎসায় বিলম্ব ঘটায়। অবস্থার অবনতি হলে কিংবা অনেক অর্থ ব্যয়ের পর তারা হাসপাতালে আসেন।

পরিবার ও স্বজনদের অবহেলার করুণ চিত্র উঠে আসে হাসপাতালের কনসালট্যান্ট ডা. একেএম শফিউল আযম-এর কথায়। তিনি জানান, ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে অনেক রোগী ভর্তি করার পর পরিবারের আর কোনো খোঁজ মেলে না। ১৯৯৫ সালে ভর্তি হওয়া রোগীও দীর্ঘকাল পরিবারের দেখা পাননি, যাদের পরে আদালতের নির্দেশে সমাজসেবা অধিদপ্তরের সেফ হোমে পাঠানো হয়েছে। এতে দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের ভোগান্তি বাড়ছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক গোলাম ফারুক সরকার মনে করেন, শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়নই যথেষ্ট নয়, মানসিক রোগের প্রতি সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের সংস্কৃতিও গড়ে তোলা জরুরি। তিনি ১,০০০ শয্যার আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণের গুরুত্বের ওপর জোর দেন। তার মতে, ১,০০০ শয্যার আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণ অবকাঠামোগত পরিবর্তন আনতে পারে।

তবে আশার কথা হলো, সম্প্রতি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ১,০০০ শয্যাবিশিষ্ট আন্তর্জাতিক মানের একটি হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট নির্মাণের জন্য ১,৩৬৫ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প অনুমোদন করেছে। হাসপাতালের পরিচালক ডা. শাফকাত ওয়াহিদ জানান, নতুন এই প্রকল্পের মাধ্যমে স্নাতকোত্তর পাঠ্যক্রম, গবেষণা ও টেলিমেডিসিন সেবা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। শয্যা সংকটের কারণে বর্তমানে অনেক রোগীকে সেবা দেওয়া সম্ভব হয় না, যা এই প্রকল্পের মাধ্যমে নিরসন করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।