এলপিজি সংকটে দিশেহারা ভোক্তা, বাড়তি দামের চাপে অতীষ্ঠ সবাই

সারা দেশে রান্নার কাজে ব্যবহৃত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির তীব্র সংকট চলছে। বাজারে এই সংকটকে পুঁজি করে ব্যবসায়ীরা বাড়তি মুনাফা লুটছে। সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা বেশি দিয়ে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এমন পরিস্থিতিতে অক্টোবরের জন্য ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হলেও, বাস্তবে তা ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ঢাকার বাইরে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে। বিইআরসি’র নতুন দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের ওপর আগামী ২৯শে অক্টোবর শুনানির তারিখ নির্ধারিত রয়েছে। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম এ মাসে ২৫২ টাকা বাড়ানোর পরও কিনতে হচ্ছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা বেশি দামে। কোথাও কোথাও পুরনো সিলিন্ডার ফেরত না নেয়ায় নতুন করে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। এর মধ্যেই আরেক দফা দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্য নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত কার্যক্রমের বিবরণীতে বলা হয়- (১) ঢাকা জেলার বিভিন্ন খুচরা ও পাইকারি দোকানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পারিচালনা করা হচ্ছে। (২) কৃত্রিম সংকট তৈরি বা নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি মূল্যে এলপিজি গ্যাস বিক্রির অপরাধে সংশ্লিষ্ট। 1, 2, 3. সতর্ক করা হচ্ছে। (৪) অক্টোবর/২০২৬ মাসে এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্য নিয়ন্ত্রণে মোট ১০টি অভিযান পরিচালনা করার কথা উল্লেখ রয়েছে এতে। কেউ কেউ অন্যদের থেকে কিনে বাজারে কিছুটা সরবরাহ করছে, আর কারও সরবরাহ নামমাত্র। এর মধ্যে অন্যান্য খরচও বাড়ানোর দাবি তুলেছেন পরিবেশক ও আমদানিকারকরা। রান্নার গ্যাসে মাসে এখন সরবরাহ করা হচ্ছে অন্তত ১ লাখ ২০ হাজার টন এলপিজি। এতে ১২ কেজি করে ৮৩ লাখ সিলিন্ডার পায় গ্রাহক। যার জন্য দরকার ৩ কোটি ৩২ লাখ সিলিন্ডার, যা এখন নিয়মিত পাওয়া যায় না। অথচ আরও অন্তত ৬০ লাখ সিলিন্ডার সক্রিয় থাকলে মাসে গ্রাহকের কাছে ১৫ লাখ সিলিন্ডারের সরবরাহ বাড়তো। ২০২১ সালে বিতরণ কোম্পানি ও খুচরা পর্যায়ে কমিশন নির্ধারণ হয়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে অন্য সিলিন্ডার কেনা, দাম ও কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে শুনানিতে বিস্তারিত আলোচনা হবে। তারা বলছে, প্রতি মাসে সমন্বয়ের সময় সৌদি কার্গো মূল্য, প্রিমিয়াম (জাহাজভাড়া, বীমা), ডলারের দর ও জ্বালানি তেলের দাম ধরে নতুন দাম নির্ধারণ করে বিইআরসি। গত বছরের নভেম্বর থেকে এলপিজি নিয়ে সংকট শুরু হয়েছিল, পরে কিছুটা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া যুদ্ধের পর আবারো সমস্যা দেখা দিয়েছে।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা নুরী মিয়া জানিয়েছেন, সরকার নির্ধারিত দামে এলপিজি পাওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাধ্য হয়ে তাকে ২৫০০ টাকা দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে। আজিমপুরের ইয়ারুল কবিরের অভিজ্ঞতাও একই; তাকে গুনতে হয়েছে ২ হাজার ৩০০ টাকা। মন্ত্রণালয় ও জ্বালানি বিভাগের প্রতিবেদনের তথ্যে উঠে এসেছে যে, ওমেরা ২,০৫০ টাকা, বসুন্ধরা ২,৩০০ টাকা, ফ্রেশ ২,১০০ টাকা, পেট্রোম্যাক্স ১,৯০০ টাকা, ইউনি ২,২০০ টাকা, ডেল্টা ২,২০০ টাকা, তীর ২,২০০ টাকা এবং আই গ্যাস ১,৯০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২৩শে অক্টোবর ঢাকা জেলা প্রশাসন কর্তৃক এলপিজি’র বাজারমূল্য তদারকি কার্যক্রমের একটি তথ্য প্রতিবেদন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব বরাবর প্রেরণ করেছে।
বাজারে এলপিজির দর নিয়ন্ত্রণে ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে
- ঢাকা জেলার বিভিন্ন খুচরা ও পাইকারি দোকানে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে।
- কৃত্রিম সংকট তৈরি বা নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি মূল্যে গ্যাস বিক্রির দায়ে বিক্রেতাদের সতর্ক করার পাশাপাশি আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
- দোকানদারদের মূল্য তালিকা প্রদর্শন ও সরকার নির্ধারিত মূল্যে বিক্রির জন্য কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
- অক্টোবর মাসে এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্য নিয়ন্ত্রণে মোট ১০টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
আমদানিকারক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২৩টি কোম্পানির অবকাঠামোগত সক্ষমতা থাকলেও আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে যথাক্রমে ১৩টি ও ১০টি কোম্পানি এলপিজি আমদানি করেছে। সরবরাহে এই ঘাটতির কারণে বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে। খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে এলপিজির দাম ও জাহাজভাড়া উভয়ই বেড়েছে। অথচ দেশে দাম সমন্বয় করা হয়েছে ৪ঠা অক্টোবর। এর অনেক আগে থেকেই আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা পণ্য মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম দাবি করেছেন, গুটিকয়েক কোম্পানি মজুতদারির মাধ্যমে এক মাসেই ৬০০ কোটি টাকার বেশি হাতিয়ে নিয়েছে। ভোক্তারা এই লুণ্ঠনের শিকার হলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিইআরসি নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তিনি আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এলপিজি পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে, যা জনজীবনে বড় প্রভাব ফেলছে। তবে যুদ্ধটা বন্ধ হলে আশা করি তা থাকবে না। তিনি বলেন, আমদানিকারকদের বড় একটা গ্রুপ এলপিজি আনতে পারছে না।
বিইআরসি’র চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, অনেকগুলো কারণে বর্তমানে এলপিজি সংকট দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। তিনি বলেন, অনেক আমদানিকারক ঋণপত্র বা এলসি খুলতে না পারায় আমদানি ব্যাহত হচ্ছে। আমেরিকা থেকে গ্যাস আমদানিতে সময় বেশি লাগে, সেই সাথে ইন্স্যুরেন্স ও জাহাজভাড়াও বাড়তি। শীতকাল সামনে আসায় ইউরোপে গ্যাসের চাহিদা বাড়বে, যা বিশ্ববাজারে সরবরাহ ও দামের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। জালাল আহমেদ আরও জানান, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট এই সংকট নিরসনে জ্বালানি বিভাগের কাছে এলসি সহজীকরণের সুপারিশ করা হয়েছে। সম্প্রতি সাংবাদিকদের এক অনুষ্ঠানে বিইআরসি’র চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ দেশে এলপিজি সংকট এবং আসন্ন শীত মৌসুম নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
এক সময় দেশে মাসে ১ লাখ ৮০ হাজার টন এলপিজি আমদানি করা হলেও বর্তমানে তা ১ লাখ ৬০ হাজার টনে নেমে এসেছে। চাহিদার তুলনায় এই ঘাটতি মেটাতে অনেক গ্রাহক এখন বিদ্যুৎচালিত চুলার মতো বিকল্পের দিকে ঝুঁকছেন। সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তাই আপাতত দাম কমার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
- অক্টোবর/২০২৬ মাসে এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্য নিয়ন্ত্রণে মোট ১০টি অভিযান পরিচালনা করার কথা উল্লেখ রয়েছে এতে।