এমপি আজিজের বিরুদ্ধে তোলপাড়: ছাত্রদল নেতা হত্যায় উত্তাল নাটোর


  প্রকাশিত হয়েছেঃ   ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ৮:৩১ এএম

নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ ও তার পুত্রকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কে উত্তাল পুরো নাটোর জেলা। সম্প্রতি গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব শাকিল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এমপি পুত্র এবং উপজেলা যুবদলের বহিষ্কৃত যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুজ্জামান মিন্টুকে তিনদিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। এই ঘটনা এলাকায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। এর মধ্যেই এমপির একটি আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে ওঠে। স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন এই দুই ঘটনা নিয়ে সমালোচনার ঝড় বইছে। গত ক’দিনের চলমান উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই খোদ এমপি আবদুল আজিজের আশালীন ভিডিও দৃশ্যত ক্ষোভের আগুলে ঘি ঢেলে দিয়েছে। এর মধ্যেই গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব শাকিল ইসলাম (৩২) দুর্বৃত্তদের হাতে খুন হন। এই হত্যা মামলায় আজিজের পুত্র নুরুজ্জামান মিন্টুকে ৩ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।

১৪ই অক্টোবর রাত ১০টার দিকে চাঁচকৈড় বাজার থেকে পায়ে হেঁটে ফেরার পথে হেলমেট পরিহিত দুই যুবকের হামলার শিকার হন শাকিল ইসলাম। তাকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়। প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরে রাজশাহী ও ঢাকা বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১২ দিন পর সোমবার রাত ৮টায় শাকিল মারা যান। ঘটনার আগে ২০শে এপ্রিল নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে ফেসবুক পোস্ট দিয়েছিলেন তিনি এবং থানায় জিডি করার কথা জানিয়েছিলেন। নিহতের বাবা রবিউল করিমের অভিযোগ, পুলিশ শাকিলের নিরাপত্তার বিষয়ে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেয়নি এবং হামলাকারীদের শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। আশফাক আহমেদ নামে প্রবাসী এক ব্যক্তির ফেসবুক আইডি থেকে প্রথমে তিনটি ভিডিও ক্লিপ প্রকাশ পায়। এমন কি এসময় তিনি নানা ধরনের অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন করেন। আশফাক নামের ওই আইডি থেকে এরইমধ্যে তার বিভিন্ন অপকর্ম ও তার দুই সন্তানের নানা ধরনের অনৈতিক কাজের সমালোচনা করা হচ্ছিল। শাকিল আহত হওয়ার পরও পুলিশ হামলাকারীদের চিহ্নিত করতে পারেনি। সেখানে থানায় সাধারণ ডায়েরি করার কথাও উল্লেখ করেছিলেন।

শাকিলের মৃত্যুর পর মঙ্গলবার নয়াপল্টনে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। রাতে গুরুদাসপুরের বিলচলন শহীদ শামসুজ্জোহা কলেজ মাঠে দ্বিতীয় জানাজা চলাকালে এমপি আব্দুল আজিজ নিহতের পরিবারকে ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দিলে বিক্ষুব্ধ জনতা ভুয়া ভুয়া স্লোগান দিয়ে প্রতিবাদ জানান। এরপর ওই এলাকা থেকে আজিজের ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলা হয় এবং চাঁচকৈড় বাজারের রাশ আরবান মেগা শপিং মলে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। বিএনপি’র জেলা নেতৃবৃন্দসহ ছাত্রদল ও যুবদলের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মীরা এখন এমপির পদত্যাগ দাবি করছেন। এদিকে শাকিলের জানাজায় আজিজের বক্তব্য দেয়ার সময় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। অপরদিকে জানাজা শেষে বিক্ষোভকারীরা একটি শপিংমল ভাঙচুর করে।

এদিকে, কেন্দ্রীয় যুবদলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নুরুজ্জামান মিন্টুকে দলের প্রাথমিক সদস্য পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। দায়িত্বে অবহেলার দায়ে গুরুদাসপুর থানার ওসি আব্দুল হান্নানকে প্রত্যাহার করে রাজশাহী রেঞ্জে সংযুক্ত করা হয়েছে বলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতেখার আলম জানিয়েছেন। অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া নিজের ভিডিওটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট দাবি করে আব্দুল আজিজ এমপি বলেন, এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তার সম্মানহানির চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তিনি এ বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছেন। তবে এই ভিডিও প্রকাশের পর বড়াইগ্রামের বনপাড়া বাইপাসসহ বিভিন্ন স্থানে এমপির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ ও নেতাকর্মীদের ক্ষোভ প্রকাশ পেতে দেখা গেছে। ফেসবুক জুড়ে সমালোচনার পাশাপাশি ধিক্কার জানাচ্ছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। প্রায় পাঁচ মিনিটের তিনটি ভিডিও ক্লিপে আজিজকে এক নারীর সঙ্গে বিভিন্ন স্পর্শকাতর কথা বলতে দেখা যায়। জাতীয়তাবাদী যুবদল কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিনহাজুল ইসলাম ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত পরিপত্রে জানা যায়, জীবনহানির মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গুরুদাসপুর উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুজ্জামান মিন্টুকে প্রাথমিক সদস্য পদ থেকে বহিষ্কারের। যুবদলের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের তাদের সঙ্গে সাংগঠনিক সম্পর্ক না রাখার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। এ ব্যাপারে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টি ভাবছি।

স্থানীয় ছাত্রদল সূত্রে জানা যায়, এমপি আব্দুল আজিজের দুই ছেলের অনুসারীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে দ্বন্দ্ব চলছিল। নিহত শাকিল ছিলেন এমপির ছোট ছেলে মাহমুদুজ্জামান সোহাগের অনুসারী। এমপির বড় ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টু উপজেলা যুবদলের বহিষ্কৃত নেতা এবং ছোট ভাই সোহাগ উপজেলা বিএনপি’র সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দুই ভাইয়ের সমর্থকদের মধ্যকার এই দ্বন্দ্ব শাকিলের হত্যাকাণ্ডের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে স্থানীয়রা মনে করছেন। ঘটনাটি এখন নাটোরের প্রধান আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে এবং এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। এই দুই ইস্যুতে টালমাটাল নাটোরের রাজনীতি।