হার্ভার্ডে ভর্তির নামে প্রতারণা, পাকিস্তানি তরুণীর লাইবার মৃত্যু

যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন পাকিস্তানের ২৪ বছর বয়সি তরুণী লাইবা ইজাজ। পদার্থবিজ্ঞানে স্বর্ণপদক পাওয়া এই মেধাবী শিক্ষার্থীর সেই স্বপ্ন পূরণ করতে জমি ও পরিবারের গয়না বিক্রি করেছিলেন বাবা রানা মুহাম্মদ ইজাজ। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের কাছ থেকে লাখ লাখ রুপি হাতিয়ে নেয় নোমান নামের এক প্রতারক। তবে ওই অর্থে লাইবার বাবা-মায়ের ক্ষতি পূরণ হওয়ার নয়। স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে জানান, প্রতিদিন সকালে বাবার জন্য চা বানিয়ে দিতেন লাইবা। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগেও আবার চা করে দিতেন। ঘুমানোর আগে বাবার কাঁধও মালিশ করে দিতেন। তাদের একজন বৃত্তি নিয়ে চীনে গিয়ে ম্যান্ডারিন ভাষা শিখছেন। সৌদি আরবে উচ্চশিক্ষার জন্য তাকে বৃত্তি দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু লাইবা যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে চেয়েছিলেন। ইজাজের স্মৃতিতে, মেয়ে তাকে বলেছিলেন, ‘আমি নিজেই সব কাজ করেছি, টিউশনিও করাই। তুমি কি আমার জন্য এটুকু করতে পারবে না?’। ইজাজ বলেন, ‘এরপর থেকেই আমরা প্রস্তুতি নিতে শুরু করি।’। কিন্তু তখন পরিবার জানত না, সেই স্বপ্নের ভিত্তি ছিল ফাঁকা প্রতিশ্রুতি ও মিথ্যা। এর মধ্যে হার্ভার্ডের ভর্তির প্রস্তাব ও বৃত্তির চিঠি, যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসনসংক্রান্ত একটি ফরম, নিউইয়র্কে বসবাসকারী এক আত্মীয়ের স্পনসরশিপের হলফনামা, লাইবার ছবি সংবলিত দূতাবাসের একটি নথি এবং বোস্টনে যাওয়ার বিজনেস ক্লাসের বিমানের টিকিট ছিল।
গত ৯ অক্টোবর ইসলামাবাদে নিজের বাড়ির কাছ থেকে লাইবার লাশ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে তিনি আত্মহত্যা করেছেন বলে অনুমান করা হলেও পরিবারের দাবি, প্রতারণার সঙ্গে জড়িত ওই ব্যক্তিই লাইবাকে হত্যা করেছেন। লাইবা বাড়ি ছাড়ার দুই ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে স্বজনরা তার লাশ খুঁজে পান। তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল মেয়ের জীবন। এ জন্য বাবার কাছে বিদেশে পড়াশোনার খরচ চান তিনি। নিজের একটি চাকরির পরিচয়পত্রও দেখান।
পরিবারের সংগ্রাম ও প্রতারণার সূচনা
ইসলামাবাদের জি-১০ এলাকার ‘রানা মালিক সেন্টার’ নামের একটি দুগ্ধজাত পণ্যের দোকানের ওপরের ফ্ল্যাটে তিন দশকের বেশি সময় ধরে পরিবার নিয়ে বাস করছেন রানা মুহাম্মদ ইজাজ। ইজাজ অষ্টম শ্রেণি এবং তার স্ত্রী দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়লেও চার মেয়েকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন। লাইবা ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর শেষে স্কুলে বিজ্ঞানের শিক্ষকতার পাশাপাশি টিউশনি করতেন। তবে তার পরিবার এ ধারণা মানতে নারাজ। তবে তাদের চার মেয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বর্ণপদক পাওয়ার দিন বোনদের সামনে আনন্দে নেচে ও লাফিয়ে উঠেছিলেন তিনি। পাশাপাশি দ্বিতীয় থেকে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বাসায় গিয়ে পড়াতেন।
চলতি বছর ইসলামাবাদের ব্লু এরিয়ার একটি কল সেন্টারে কাজ করার সময় নোমানের সঙ্গে লাইবার পরিচয় হয়। নোমান ওই এলাকায় তাদের দোকানে যাতায়াত শুরু করেন এবং সুপ্রিম কোর্টের ভুয়া পরিচয়পত্র দেখিয়ে আস্থা অর্জন করেন। সরকারি কর্মচারী হওয়ায় লাইসেন্স লাগবে না দাবি করে তিনি লাইবাকে হার্ভার্ডে ভর্তির সুযোগ করে দেওয়ার প্রস্তাব দেন।
লাখ লাখ রুপি আত্মসাৎ ও ভুয়া নথি
ভর্তির ফি ও অন্যান্য খরচের কথা বলে নোমান দফায় দফায় পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নেন। ইজাজ জানান, প্রথমে ২২ লাখ রুপি এবং পরে হার্ভার্ডের তহবিলের প্রমাণ হিসেবে ৭২ লাখ রুপির কথা বলা হয়। মেয়েকে সাহায্য করতে নিজের জমি ও গয়না বিক্রি করেন বাবা। নোমান হার্ভার্ডের ভুয়া অফার লেটার, ব্যাংক হিসাবের বিবরণী ও ভিসা অনুমোদনের নথিপত্রও তাদের দেন। এর পর নোমান জানান, হার্ভার্ডে আবেদনের জন্য ৭২ লাখ রুপির আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ দেখাতে হবে। পরিবারের গয়নাও বিক্রি করেছি, যাতে চাওয়া ৭২ লাখ রুপি জোগাড় করতে পারি।’। পরে পরিবারের এক আইনজীবী প্রতিবেশী পুরো ফাইলটি পরীক্ষা করে জানান, কোনো নথিই আসল নয়।
- ইজাজ জানান, নোমানকে মোট কত টাকা দেওয়া হয়েছিল তার একটি বড় অংশই ছিল তাদের সারাজীবনের সঞ্চয়।
- সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে নোমান ১২ লাখ রুপির ব্যাংক গ্যারান্টির ভুয়া নথি তুলে দেন।
- অক্টোবরের শুরুতে ভিসা সাক্ষাৎকারের কথা বলে নোমান যোগাযোগ এড়িয়ে যেতে শুরু করেন।
নোমানের কথায় সন্দেহ হলে পরিবার নথিগুলো একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে নিয়ে যায়। সেখানে তারা জানতে পারেন, বোস্টনে যাওয়ার কোনো টিকিট বা আবেদন প্রক্রিয়া বাস্তবে হয়নি এবং সব কাগজপত্র সম্পূর্ণ ভুয়া। এই খবর শোনার পর পরিবার চরম ধাক্কা খায়।
নিখোঁজ ও নির্মম পরিণতি
৯ অক্টোবর শুক্রবার ইজাজ দোকান বন্ধ করার সময় লাইবা জানান, নোমান একটি বার্তা পাঠিয়েছেন। বাবা মেয়েকে ঘর থেকে বের হতে নিষেধ করলেও নোমানের বার্তার পর মায়ের আপত্তি সত্ত্বেও লাইবা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। পরে এক বোনের সাহায্যে মোবাইলের অবস্থান ট্র্যাক করে এবং স্বজনরা গিয়ে তার লাশ দেখতে পান। পরে ভুয়া কাগজপত্রের বিষয়টি জানাজানি হলে ভেঙে পড়েন লাইবা।
আলজাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে লাইবার ভগ্নিপতি জায়েদ বিন আফজাল বলেন, ‘লাইবাকে খুঁজে পাওয়ার পর আমাদের মনে হয়েছে, সে নিজে এমন কিছু করতে পারে না। সে আত্মহত্যা করেনি, তাকে হত্যা করা হয়েছে।’
অভিযুক্তের গ্রেপ্তার ও হেফাজতে মৃত্যু
লাইবার মৃত্যুর পর প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ অভিযুক্ত নোমানকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন।
পুলিশ ও এফআইএ পৃথক মামলা করার পর মৃত্যুর দুই দিন পর নোমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে ২০ অক্টোবর পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় গুলিতে নোমানের মৃত্যু হয়। পুলিশের ভাষ্য, তদন্তের স্বার্থে প্রমাণ উদ্ধারে যাওয়ার সময় দুটি মোটরসাইকেলে আসা চার সহযোগী তাকে ছিনিয়ে নিতে গুলি চালালে নোমান গুলিবিদ্ধ হন।
তদন্ত ও পরিবারকে অর্থ হস্তান্তর
২১ অক্টোবর পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি লাইবার পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন। এ সময় নোমানের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়ে পাঁচ মিলিয়ন রুপির (প্রায় ১৮ হাজার মার্কিন ডলার) বেশি অর্থ লাইবার পরিবারের হাতে তুলে দেন তিনি। তবে পরিবারের মতে, কোনো অর্থ দিয়েই তাদের মেয়ের মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ সম্ভব নয়।
আলজাজিরাকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, ঘটনার তদন্ত এখনো চলছে। ভিডিও ফুটেজে লাইবাকে হাতে মোবাইলফোন নিয়ে একা বাড়ি থেকে বের হতে দেখা গেছে। মৃত্যুর চূড়ান্ত কারণ নিশ্চিত হতে ফরেনসিক প্রতিবেদনের জন্য আরও ১৫ থেকে ২০ দিন সময় লাগবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।