ট্রাম্পের লাগাম কতটা টেনে ধরতে পারবেন ডেমোক্র্যাটরা


  প্রকাশিত হয়েছেঃ   ৫ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৩৩ এএম

কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমতার নতুন হিসাব

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের জয় অর্জন করেছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। এর মাধ্যমে তারা কংগ্রেসের উভয় কক্ষের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার পথে একধাপ এগিয়ে গেল। তবে আগামী বছরের জানুয়ারি মাসের আগে ডেমোক্র্যাটরা আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন এই কংগ্রেসের দায়িত্ব নিতে পারছে না। এমনকি ক্ষমতা হাতে পাওয়ার পরও নীতিগত কিংবা আইনি ক্ষেত্রে কাজ করতে গিয়ে তাদের রিপাবলিকানদের সঙ্গে অনেক জটিল হিসাব মেলাতে হবে। সিনেটে যে কোনো আইন বা বিল সাধারণ প্রক্রিয়ায় পাস করাতে হলে ন্যূনতম ৬০টি ভোটের প্রয়োজন পড়ে, যা এককভাবে কোনো দলের পক্ষে নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে। সিনেটে কোনো বিল পাস করাতে সাধারণত ৬০ ভোট প্রয়োজন হয়। বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে নির্বাচনি প্রচার চালিয়েছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত অভিশংসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোনো প্রেসিডেন্টকে পদ থেকে সরানো হয়নি।

অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে স্পষ্ট বার্তা দিয়ে রেখেছেন। সোমবারের একটি পডকাস্ট অনুষ্ঠানে সরাসরি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি সবকিছুতে ভেটো দেব।’ এ ধরণের কঠোর অবস্থানের কারণে নতুন বছরের শুরুতে ক্ষমতা গ্রহণের পর ডেমোক্র্যাটরা কতটা স্বাধীনভাবে তাদের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পারবে, তা বড় এক রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান যুদ্ধ বন্ধ করা এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে নানা ক্ষেত্রে জবাবদিহির মুখোমুখি করার অঙ্গীকার বাস্তবায়নে তাঁদের বড় ধরনের বাধার মুখোমুখি হতে হবে।

জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও স্বাস্থ্যসেবার সংকট

মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের সময়ে সাধারণ মার্কিন ভোটারদের প্রধান দুশ্চিন্তার বিষয় ছিল নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য ও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়। ডেমোক্র্যাটরা মূল্যস্ফীতি কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে এ জয় পেলেও তা বাস্তবায়ন সহজ নয়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক শীর্ষস্থানীয় গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর ইকোনমিক অ্যান্ড পলিসি রিসার্চের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ডিন বাকের এ বিষয়ে একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে মার্কিন প্রশাসন ও ইরানের মধ্যে যে সংঘাত শুরু হয়েছে, তা জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের দাম আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এছাড়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টির কারণে এই ব্যয় বৃদ্ধির হার আরও দ্রুত হয়েছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে করা এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, ৬৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা বা আইসিই তাদের কার্যক্রমে ‘সীমা ছাড়িয়ে গেছে’। তবে ত্রিতা পারসির মতে, এ বিষয়ে নিষ্ক্রিয় থাকা রাজনৈতিকভাবে দলটির জন্য টেকসই হবে না।

ডিন বাকের উল্লেখ করেন যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরকারের ওপর নীতিগত চাপ সৃষ্টি করতে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিজস্ব তদন্ত ও তদারকির ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারে। যুদ্ধের ব্যয় হ্রাস এবং হরমুজ প্রণালির সংকটের সমাধান করা গেলে পরোক্ষভাবে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে আনাও সম্ভব হতে পারে। বাকেরের মতে, বাজেট সংক্রান্ত বিলে শর্ত জুড়ে দেওয়া বা পররাষ্ট্রনীতিতে নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপ পর্যালোচনা করার মাধ্যমে ডেমোক্র্যাটরা সরকারকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক সংঘাত বন্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এতে তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবা ভর্তুকি ও সাশ্রয়ী আইন রক্ষা

যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগণের দৈনিক খরচের বড় একটি অংশ দখল করে থাকে স্বাস্থ্যসেবা খাত। এই খাতের সংকট সরাসরি সাধারণ মার্কিন পরিবারের অর্থনৈতিক সক্ষমতায় আঘাত হানে। ২০২৫ সালে এসে সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা আইন বা অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্টের আওতায় এতদিন যেসব বর্ধিত সরকারি ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছিল, তার আইনি মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। ফলে সাম্প্রতিক সময়ে বহু মার্কিন নাগরিকের স্বাস্থ্যবিমার প্রিমিয়াম বা মাসিক কিস্তির পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাকেরের মতে, এই সংকট নিরসনে উভয় দলের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে কিছুটা হলেও সমঝোতার জায়গা তৈরি হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, সরকারি পরিচালন ও ব্যয় সংক্রান্ত মূল বিলে ডেমোক্র্যাটরা স্বাস্থ্যসেবা সাশ্রয়ী করার এসব সামাজিক প্রস্তাব যুক্ত করে দিতে পারে। রিপাবলিকানদের বড় একটি অংশও চাইবে না তাঁদের সাধারণ ভোটাররা এ ধরণের মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হোক। বাকেরের ভাষায়, ‘ট্রাম্প-পরবর্তী সময়ে থাকা রিপাবলিকানরা মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া বন্ধ করা কিংবা স্বাস্থ্যসেবার জন্য বেশি অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য করার পক্ষে থাকতে চাইবেন বলে মনে হয় না।’ বুধবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, এ নিয়ে তিনি ‘একটুও’ উদ্বিগ্ন নন। এ নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে।

কর ও শুল্কনীতির অভিঘাত এবং করপোরেট নিয়ন্ত্রণ

ভোক্তা পর্যায়ে পণ্য ও সেবার ব্যয় বাড়ানোর পেছনে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর আরোপিত বিভিন্ন আমদানিকৃত শুল্কনীতি বড় ভূমিকা পালন করেছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, কর ও শুল্ক সংক্রান্ত বিধিনিয়মে পরিবর্তন আনা ডেমোক্র্যাটদের জন্য চ্যালেঞ্জিং হবে, তবে সেখানেও পথ খোলা রয়েছে। উদারপন্থি অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্রাউন্ডওয়ার্ক কোলাবোরেটিভের নীতি ও প্রচারবিষয়ক প্রধান অ্যালেক্স জ্যাকেজ বাজার বাস্তবতার উদাহরণ টেনে আলজাজিরাকে বলেন, ‘দাম রকেটের মতো দ্রুত বাড়ে, কিন্তু পালকের মতো ধীরে কমে।’

জ্যাকেজ মনে করেন, ট্রাম্পের সরাসরি প্রশাসনিক সম্মতি না পেলেও বাজার নিয়ন্ত্রণে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা তাঁদের বিশেষ সংসদীয় ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন। কংগ্রেসের বিশেষ কমিটিগুলোর মাধ্যমে বাজারে অন্যায্য দাম বাড়ানো কিংবা অতিরিক্ত মুনাফাখোরি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। জ্যাকেজ আলজাজিরাকে বলেন, ‘কমিটির নেতৃত্বের ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে এবং প্রধান নির্বাহীদের তলব করে কংগ্রেসে হাজির করানোর মাধ্যমে বাস্তব কিছু ফল পাওয়ার অনেক নজির রয়েছে।’ এই ধরণের শুনানির কারণে বড় কোম্পানিগুলোর মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ সময়ের মধ্যে বিদায়ী কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে নিজের বাকি আইনগত অগ্রাধিকারগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে পারেন ট্রাম্প।

ট্রাম্প প্রশাসন ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে তদন্তের রূপরেখা

কংগ্রেসে একক প্রভাব প্রতিষ্ঠার পর ডেমোক্র্যাটদের নজর থাকবে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ড এবং তাঁর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ব্যবসায়িক লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গভর্নমেন্ট অ্যাফেয়ার্স ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো লরা ব্লেসিংয়ের মতে, ডেমোক্র্যাটরা তদারকি ও অনুসন্ধানী ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি খাটাবে ট্রাম্পের ওপর নজরদারি জোরদার করার কাজে। আলজাজিরাকে পাঠানো এক বিশেষ ই-মেইলে ব্লেসিং মন্তব্য করেন, ‘সময় ব্যয় এবং সংবাদপত্রের শিরোনামের বিচারে ডেমোক্র্যাটদের সবচেয়ে বেশি তৎপরতা দেখা যাবে এই ক্ষেত্রেই।’ পারসি বলেন, ‘তখন এটি আর শুধু ট্রাম্পের যুদ্ধ থাকবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী হোয়াইট হাউসের আগাম প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়াই কংগ্রেস নিজ উদ্যোগে যে কোনো সরকারি নীতি ও অনিয়মের তদন্ত চালিয়ে যেতে পারে। এর মাধ্যমে সরকারের ভেতরের স্বজনপ্রীতি, সরকারি অর্থের অপব্যবহার বা ক্ষমতার অপব্যবহার উন্মোচন করা সম্ভব। জানুয়ারিতে নতুন কংগ্রেস আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করার সাথে সাথেই ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্প পরিবারের সম্পদের উৎস অনুসন্ধান সংক্রান্ত বৃহৎ রূপরেখা উন্মোচন করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।

সম্পদের উৎস, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও বলরুম বিতর্ক

চলতি বছরের প্রথমার্ধে প্রকাশিত ট্রাম্পের অফিসিয়াল আর্থিক বিবরণীর তথ্য অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তাঁর ব্যক্তিগত মোট সম্পদের মূল্য প্রায় ২২০ কোটি মার্কিন ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সংক্ষিপ্ত সময়ে ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক পরিধি বহু গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বব্যাপী তাঁদের ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন, আধুনিক দ্রোন তৈরি প্রকল্প, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি খাত এবং নানা ভবিষ্যৎমুখী অবকাঠামো ব্যবসায় বড় অংকের বিনিয়োগ নিবন্ধিত হয়েছে।

এসব বিষয় সামনে রেখে ডেমোক্র্যাট সিনেটররা এখন থেকেই আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছেন। তারা ইতোমধ্যেই সরকারের একাধিক নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা, বিচার বিভাগ এবং ট্রাম্প পরিবারের মালিকানাধীন বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট বেসরকারি সংস্থাসমূহে প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠাতে শুরু করেছেন। এসব চিঠিতে স্পষ্টভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যাতে ট্রাম্প সংক্রান্ত যাবতীয় প্রাসঙ্গিক নথিপত্র এবং রেকর্ড সংরক্ষিত ও অক্ষত রাখা হয়। তদন্তের সম্ভাব্য অন্য বিষয়ের মধ্যে রয়েছে—হোয়াইট হাউসের নতুন বলরুম তৈরিতে যেসব ধনকুবের বা ব্যক্তিবর্গ বিপুল অঙ্কের অর্থ অনুদান বা সাহায্য দিয়েছেন, পরবর্তীতে তাঁরা ট্রাম্প সরকারের থেকে কোনো বিশেষ আইনি সুবিধা কিংবা বড় বাণিজ্যিক চুক্তি পেয়েছেন কি না।

সমনের মুখোমুখি হওয়া ও আইনি জটিলতা

কংগ্রেশনাল কমিটির এই ধরণের অনুসন্ধান কতটা সফল বা কার্যকরী হবে, তা নিয়ে নানামুখী প্রাতিষ্ঠানিক সংশয় বিদ্যমান। অতীতের ঘটনা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি নির্ধারক ও শীর্ষ কর্মকর্তারা সচরাচর কংগ্রেসের এই জাতীয় অনুসন্ধানমূলক সমন উপেক্ষা করে থাকেন কিংবা তা আদালতে চ্যালেঞ্জ করে মামলা ঠুকে দেন। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা আদালতে সমন চ্যালেঞ্জ করতে পারেন এবং দীর্ঘ মেয়াদে আইনি লড়াই চালিয়ে প্রক্রিয়াটিকে দীর্ঘসূত্রী করে তুলতে পারেন।

লরা ব্লেসিং মনে করেন যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পরিবারের অতি ঘনিষ্ঠ সদস্য বা ব্যবসায়িক সহযোগীরা সমন পেয়ে স্বেচ্ছায় কংগ্রেসে হাজিরা দিয়ে সত্য বয়ান দেবেন, এমনটা আশা করা একেবারেই অবাস্তব। এর পাশাপাশি, তদারকি কমিটি কোনো আর্থিক অনিয়ম বা দুর্নীতির বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ করলেও, ট্রাম্প প্রশাসনের আইন মন্ত্রণালয় বা বিচার বিভাগ তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি বা দেওয়ানি মামলা করবে কি না তা নিশ্চিত নয়। কারণ বর্তমান বিচার ব্যবস্থার কাঠামোগত আইনি ক্ষমতা মূলত নির্বাহী প্রধান বা ট্রাম্প প্রশাসনের হাতেই ন্যস্ত থাকবে।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের অভিশংসন আলোচনা

কংগ্রেসের তদারকি ক্ষমতার অংশ হিসেবে বিতর্কিত সরকারি মন্ত্রীদের অভিশংসন করার একটি বিশেষ ক্ষমতা প্রতিনিধি পরিষদের হাতে রয়েছে। বর্তমানে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সহ একাধিক বিতর্কিত শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিশংসনের উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়ে সক্রিয় চিন্তাভাবনা করছেন। সামরিক ক্ষেত্রে তাঁর নানা সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ মার্কিন রাজনীতিতে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এ ছাড়া ১৯৭৩ সালের ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্ট অনুযায়ী, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া শুরু করা কোনো সামরিক সংঘাত ৬০ দিনের বেশি চালানোর ক্ষেত্রে আইনপ্রণেতাদের তা বন্ধের উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

রিপাবলিকান প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য থমাস ম্যাসি ইতোমধ্যে প্রকাশ করেছেন যে, আগামী সপ্তাহে বিদায়ী কংগ্রেসের নতুন অধিবেশন শুরু হওয়ার পরপরই এই অভিশংসনসংক্রান্ত বেশ কিছু প্রাথমিক প্রস্তাব তোলা হতে পারে। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে তাঁর আগের প্রথম মেয়াদে দুই দুবার অভিশংসিত হওয়ার ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে পাত্তা দেননি। তৃতীয়বারের মতো কোনো অভিশংসনের উদ্যোগকে তিনি উড়িয়ে দিয়েছেন এবং গণমাধ্যমের সামনে দাবি করেছেন যে এ ধরনের ভিত্তিহীন প্রক্রিয়া রিপাবলিকানদের লাভবান করবে।

ট্রাম্প কঠোর মন্তব্য করে বলেন, ‘আমার মনে হয়, তারা এমনটা করলে ডেমোক্রেটিক পার্টি ধ্বংস হয়ে যাবে। কারণ, কোনো কারণ ছাড়াই তারা বারবার এ ধরনের কাজ করছে।’ এছাড়া প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথের পক্ষ নিয়ে সাফাই গেয়ে ট্রাম্প স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রী ‘খুব ভালো কাজ করছেন’। যদি প্রতিনিধি পরিষদ কোনো কর্মকর্তাকে অভিশংসিত করেও ফেলে, তথাপি তা কার্যকর হতে বিচার বিভাগীয় ট্রায়াল বা শুনানি সিনেটে অনুষ্ঠিত হতে হবে, যেখানে ডেমোক্র্যাটদের প্রয়োজনীয় চরম সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভাব একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করবে। কোনো নির্বাচিত কর্মকর্তাকে পদ থেকে সরাতে সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন লাগবে।

অভিবাসন খাত ও আইসিই (ICE)-এর ব্যয় তদারকি

ডেমোক্র্যাটদের জন্য আরেকটি অত্যন্ত সংবেদনশীল তদারকি ক্ষেত্র হলো ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতি এবং এর পেছনে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে খরচ করা হাজার হাজার কোটি টাকা। ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে ইউএস ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট বা আইসিই (ICE)-এর গণগ্রেফতার অভিযান এবং প্রবাসীদের ফেরত পাঠানোর কার্যক্রমে লাগাম টানতে ডেমোক্র্যাটদের কঠোর অবস্থানের বিকল্প নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইমিগ্রেশন ল সেন্টারের নীতিবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট হেইডি অল্টম্যান এই বিষয়ে একটি গভীর বিশ্লেষণাত্মক মন্তব্য পেশ করেছেন। তাঁর মতে, নতুন প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট কমিটিগুলোর পক্ষ থেকে সরকারের আটককেন্দ্রগুলোর ভেতরের অমানবিক পরিবেশ, বন্দীদের নির্যাতনের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ এবং দেশের সাধারণ করদাতাদের কোটি কোটি ডলার কীভাবে অভিবাসন আইন বাস্তবায়নে ব্যবহৃত হচ্ছে তা সরাসরি খতিয়ে দেখা উচিত।

বাজেট ছাঁটাই ও প্রশাসনিক ক্ষমতা হ্রাস

হেইডি অল্টম্যানের দেয়া তথ্যানুযায়ী, বিগত মাত্র দুই বছরের স্বল্প মেয়াদে ট্রাম্প প্রশাসনকে দেশের অভ্যন্তরে অভিবাসন আইন প্রয়োগ ও সীমান্ত সুরক্ষার নামে প্রায় ২৪ হাজার কোটি (২৪০ বিলিয়ন) ডলার সরকারি তহবিল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অল্টম্যান জোর দিয়ে বলেন যে, বিপুল পরিমাণ অর্থ ও অবারিত বাজেট পাওয়ার কারণেই আইসিই (ICE) প্রায় কোনো বড় ধরনের আইনি বাধা ছাড়াই দেশব্যাপী কঠোর ও বিতর্কিত অভিযান চালাতে সক্ষম হচ্ছে।

অল্টম্যান মনে করেন, এই অভিবাসন অভিযানগুলোর অনৈতিক গতি কমানো এবং সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নতুন শৃঙ্খলা আনার একমাত্র উপায় হলো তাদের বরাদ্দ কমানো। অল্টম্যান বলেন, ‘অভিযানের গতি কমানো এবং প্রকৃত অর্থে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, অগ্রাধিকার নির্ধারণ ও আইন প্রয়োগে নিয়ন্ত্রণ আনতে হলে আগের অধিবেশনে দেওয়া অর্থের বড় অংশ ফিরিয়ে নিয়ে তাদের বাজেট উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে হবে।’

তিনি মনে করেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও মার্কিন ভোটারদের মানবাধিকার সংক্রান্ত দাবির মুখে ডেমোক্র্যাটদের হাত গুটিয়ে বসে থাকার সুযোগ নেই। সংসদীয় বাধা থাকা সত্ত্বেও তাদের সর্বাত্মক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হবে। অল্টম্যান স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে বলেন, ‘আমাদের জন্য সবচেয়ে খারাপ হবে হাত গুটিয়ে বসে থাকা এবং বলা যে আমাদের ক্ষমতা সীমিত।’ এরপর তাকে চ্যালেঞ্জ জানান—মার্কিন জনগণের বিপুল সমর্থন রয়েছে, এমন কোনো বিলে স্বাক্ষর না করার সাহস তিনি দেখাতে পারেন কি না। অর্থাৎ ডেমোক্র্যাটদের জনগণের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিলে ট্রাম্পকে স্বাক্ষর করাতে বাধ্য করার রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বন করতে হবে। তবে তদন্তে সংশ্লিষ্ট সবাই সহযোগিতা করবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই।